Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা চলচ্চিত্রের দুই দিকপাল সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak)। তাঁদের সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা, এবং জীবনের প্রতি দার্শনিক দৃষ্টি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও, একে অপরের অস্তিত্বকে তাঁরা গভীরভাবে অনুভব করতেন। তাঁদের সম্পর্কের ইতিহাস জুড়ে আছে প্রশংসা, সমালোচনা, অভিমান, এবং সর্বোপরি এক ধরনের সৃষ্টিশীল শ্রদ্ধা।

‘অভিযান’ থেকে অভিমান (Ritwik Ghatak)
সত্যজিতের অনুরোধে একদিন ‘অভিযান’ দেখতে গিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু মাঝপথেই রেগে উঠে চলে আসেন হল থেকে। পরে মদ্যপ অবস্থায় অভিনেতা তুষার তালুকদারকে বলেন, “মৃণাল বলল ছবিটা দেখে এসো, দেখবে মানিকবাবু অযান্ত্রিক-এর হুবহু কপি করেছেন। গিয়ে দেখি তাই! অসংখ্য ফ্রেম একেবারে এক! খেপে গিয়ে উঠে এলাম, কারণ ছবিটা দাঁড়ায়নি।” তবু পরিহাসের বিষয়, তাঁর নিজের ‘অযান্ত্রিক’-এর বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত “সত্যজিৎ রায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন!” এমনকি ‘অশনি সঙ্কেত’-এর সময়ও সেই শুভেচ্ছা বজায় ছিল।
‘অশনি সঙ্কেত’-এর পর হতাশ (Ritwik Ghatak)
হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ‘অশনি সঙ্কেত’ দেখতে গিয়েছিলেন ঋত্বিক। কিন্তু ফিরে এসে বলেছিলেন “মানিকবাবু চূড়ান্ত ধেড়িয়েছেন। মৃত্যুর মিছিল দেখিয়ে আমার মতো অসুস্থ লোককে আরও সঙ্কটে ফেললেন!” ঋত্বিকের মতে, গল্পের শেষ হওয়া উচিত জীবনের পুনর্জন্মে, মৃত্যুর মধ্যে নয়। তিনি বলেছিলেন, “মৃত্যুর মিছিল নয়, নতুন জীবনের সৃষ্টি এইটাই শেষ কথা।” তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘সুবর্ণরেখা’-র মতো ছবিগুলির শেষ দৃশ্যে সেই আশাবাদী ইঙ্গিত বারবার ফিরে এসেছে।

অভিমান নয়, অন্তর্লীন মমতা (Ritwik Ghatak)
যদিও বহু জায়গায় সমালোচনা করেছেন, তবু সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শত্রুতার ছিল না। ১৯৬৫ সালে রায়ের সুপারিশেই ঋত্বিকের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ায় (পুণে) অধ্যাপকের পদে যোগ হয়। শোনা যায়, ঋত্বিক ট্যাক্সি নিয়ে লেক রোডে সত্যজিতের বাড়ির সামনে যেতেন, বাইরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেন, “কত?” আর সত্যজিৎ মিটিয়ে দিতেন বিল! এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, অভিমান থাকলেও বন্ধুত্বের বন্ধন কখনও ছিন্ন হয়নি।
রায়ের চোখে ঘটক (Ritwik Ghatak)
সত্যজিৎ একবার বলেছিলেন “ঋত্বিক এক রহস্যময় কারণে হলিউডের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি আমার থেকেও বেশি বাঙালি। এটাই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান বৈশিষ্ট্য।”।‘পথের পাঁচালী’-এর পর ঋত্বিকের সমালোচনা সত্ত্বেও রায় তাঁকে প্রতিভাবান বলেই চিনেছিলেন। রায়ের ভাষায়, “ছবিটা দেখে যে ভাবে বিশ্লেষণ করেছিল, বুঝেছিল, তাতে আমি জানতাম সে ছবি করলে ভালো করবে।”
ঘটকের দৃষ্টিতে রায়ের দুর্বলতা
ঋত্বিক মনে করতেন, ‘পথের পাঁচালী’-তে দুর্গার মৃত্যুর দৃশ্য কিছুটা কাঁচা। তিনি বলেছিলেন, “দুর্গার মৃত্যুর খবরে হরিহর বা সর্বজয়ার প্রতিক্রিয়া ঠিকমতো ফুটেনি, দক্ষিণা ঠাকুরের তারসানাইয়ের সুর অভিনয়কে ছাপিয়ে গিয়েছে।” তাঁর দৃষ্টিতে, রায়ের সিনেমা বুদ্ধির, আর তাঁর নিজেরটা ছিল অনুভূতির এক গভীর মানবিক বেদনার ভাষা।
আরও পড়ুন: Ritwik Ghatak: থিয়েটার না সিনেমা! কোন মঞ্চে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি?
চোখের কোণে নীরব অশ্রু
ঋত্বিকের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন মৃণাল সেন, বিজন ভট্টাচার্য, পূর্ণেন্দু পত্রী প্রমুখ। সভা শেষে যখন সত্যজিৎ পকেট থেকে চশমা বের করছিলেন শোকপ্রস্তাব পাঠের জন্য, তখন সবাই দেখলেন চোখের কোণে একবিন্দু অশ্রু! তাঁর সেই নীরব অশ্রুই যেন বলে দিচ্ছিল, সব মতভেদ, তর্ক, ও শিল্প-দ্বন্দ্বের ওপারে ছিল গভীর শ্রদ্ধা, একজন শিল্পীর প্রতি আরেকজন শিল্পীর নিঃশব্দ ভালোবাসা।



