Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার জি ফাইভ বাংলায় মুক্তি পেয়েছে পরিচালক অভিরূপ ঘোষের নতুন ওয়েব সিরিজ ‘কালীপটকা’ (Kaalipotka)। ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই আলোচনা হিংসা, স্ল্যাং, ডার্ক হিউমার আর চার ‘মারকাটারি’ নারীর গল্প ঘিরে। কিন্তু সিরিজটি আদৌ কি কেবল চার নারীর অপরাধ-উত্তর অভিযাত্রা? নাকি এর ভিতরে লুকিয়ে আছে সমকালীন সমাজের আরও গভীর, আরও অস্বস্তিকর এক প্রতিচ্ছবি?

চার নারী, চার জীবন, এক বাস্তবতা (Kaalipotka)
‘কালীপটকা’র কেন্দ্রীয় চরিত্র চারজন নারী যাঁরা কেউই তথাকথিত ‘হিরোইন’ নন, আবার ভিকটিম হিসেবেও নিজেদের সংজ্ঞায়িত করেন না। এই চারজনের জীবন আলাদা হলেও সামাজিক অবস্থান এক, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক আর্থসামাজিক বাস্তবতা, যেখানে নৈতিকতার বিলাসিতা নেই, আছে শুধু টিকে থাকার লড়াই। শ্রীমা (স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়): ট্যানারিতে কর্মরত এক শ্রমিক, বস্তিবাসী জীবনের কড়া বাস্তবতায় অভ্যস্ত, রানি (শ্রুতি দাস): দিনে টোটোচালক, রাতে দেহব্যবসায়ী দ্বৈত জীবনের নির্মম হিসেব, মিনতি (শ্রেয়া ভট্টাচার্য): অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে জীবন টেনে নিয়ে চলা এক নারী, রিঙ্কু (হিমিকা): বিউটি পার্লার থেকে ছাঁটাই হয়ে সস্তা উত্তেজক রিল বানিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা।

এক ঘটনা, বদলে যাওয়া চারটি ভাগ্য (Kaalipotka)
গল্পের মোড় ঘুরে যায় একটি বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে। সেই ঘটনার পর পুলিশ, পাড়ার ডন (অনির্বাণ চক্রবর্তী) এবং গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এই চার নারী। এখান থেকেই শুরু হয় ‘কালীপটকা’র আসল যাত্রা যা অপরাধকাহিনি হলেও তা একমাত্রিক নয়। অভিরূপ ঘোষ এই সিরিজে অপরাধকে রোমান্টিসাইজ করেন না, আবার নৈতিকতার পাঠও দেন না। বরং দেখান, পরিস্থিতির চাপে মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সেই সিদ্ধান্ত ঠিক না ভুল, তা বিচার করার দায়িত্ব দর্শকের।
ডার্ক কমেডির মোড়কে কঠিন বাস্তব (Kaalipotka)
ট্রেলার দেখে অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন অতিরিক্ত হিংসা, অশ্রাব্য ভাষা। কিন্তু পরিচালক নিজেই স্পষ্ট করেছেন, ‘কালীপটকা’ আদতে একটি ডার্ক কমেডি। এখানে ভয়ংকর বা সিরিয়াস পরিস্থিতির মধ্যেও চরিত্রদের প্রতিক্রিয়া, সংলাপ এবং আচরণে এক ধরনের তির্যক হাস্যরস রয়েছে। এই কমেডি স্ল্যাপস্টিক নয়, বরং জীবনের নিষ্ঠুরতাকে ব্যঙ্গের আয়নায় দেখানোর প্রয়াস। হয়তো এই জায়গাটাই ‘কালীপটকা’কে আর পাঁচটা ক্রাইম থ্রিলার থেকে আলাদা করে।
‘ফোর স্কোয়ার’ থেকে ‘ফোর-বিডেন’ (Kaalipotka)
‘মৃগয়া’য় চার পুলিশ অফিসারের গল্প বলেছিলেন অভিরূপ ঘোষ। সেই সিরিজে ক্ষমতা ছিল ইউনিফর্মের হাতে। আর ‘কালীপটকা’য় ক্ষমতা নেই বরং কুড়িয়ে নিতে হয়। নিজের কথাতেই পরিচালক স্বীকার করেছেন, ‘মৃগয়া’য় চার চরিত্রের ব্যালান্স তিনি পুরোপুরি রাখতে পারেননি। ‘কালীপটকা’য় সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সচেতন চেষ্টা রয়েছে। চার নারী চরিত্রই সমান গুরুত্বপূর্ণ, সমান স্ক্রিন স্পেসে উপস্থিত, আর সবচেয়ে বড় কথা চারজনের কেমিস্ট্রি এখানে গল্পের প্রাণ।

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের ‘আনসাউথ কলকাতা’ (Kaalipotka)
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের কেরিয়ারে এই চরিত্র নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। ট্যানারিতে কাজ করা, বস্তিতে থাকা শ্রীমা চরিত্রে তাঁকে কাস্ট করা নিয়ে অভিনেত্রী নিজেও প্রথমে অবিশ্বাসে ভুগেছিলেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর ডিকশন পরিবর্তনের চেষ্টা। ‘সাউথ কলকাতা’ উচ্চারণ, শরীরী ভাষা সব ঝেড়ে ফেলে এক সাব অল্টার্ন বাস্তবতা নির্মাণে তিনি সচেতনভাবে পরিশ্রম করেছেন। এটি নিছক অভিনয় নয়, বরং চরিত্রে ঢুকে পড়ার আন্তরিক প্রয়াস।
জিরো গিল্ট, জিরো শেম, জিরো অ্যাপোলজি (Kaalipotka)
স্বস্তিকার বক্তব্যে সিরিজের দর্শন যেন স্পষ্ট হয়ে যায়। শ্রীমা আর রানি এই দুই চরিত্র বিশেষভাবে প্রতিনিধিত্ব করে এক ভিন্ন নারীচেতনা। এরা নিজেদের সিদ্ধান্তের জন্য লজ্জিত নয়, অনুতপ্ত নয়, ক্ষমাও চায় না। সমাজ যাকে ‘ভুল’ বলে, তারা তাকে জীবনের বাস্তব প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের কর্মফল তারা মাথা উঁচু করেই বহন করে নিজেদের জাস্টিফাই না করে।
আরও পড়ুন: Assembly Elections: বিধানসভা ভোটের আগে ফের জোট-জট! সংযুক্ত মোর্চার ভবিষ্যৎ কি বিশ বাঁও জলে?
ফেমিনিজম না বাস্তবতা?
‘কালীপটকা’র ক্যাচলাইন ‘নারীর পাওয়ার, ফাটবে সবার’ শুনে অনেকেই একে ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডা বলে দাগাতে পারেন। কিন্তু অভিরূপ ঘোষ নিজে সেই তকমা নিতে নারাজ। তিনি বরং বলেন, নারী যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, নিজের জীবন নিজে নিয়ন্ত্রণে নেয় তাহলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভয় পায়। এখানেই ‘কালীপটকা’র রাজনৈতিক অবস্থান যা মুখে বলা নয়, গল্পের ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।



