Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরান এই তিন শক্তির সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও এক গভীর অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত (India Economy)। ড্রোন, মিসাইল ও পাল্টা আঘাতের আবহে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে একটি নাম হরমুজ় প্রণালী। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। ফলে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের কাছে এই পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের।
বৈশ্বিক জ্বালানির লাইফলাইন (India Economy)
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরানের উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারির মধ্যে একাধিক শিপিং সংস্থা সাময়িকভাবে এই পথে চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড দাবি করেছে, উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তারা প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ জারি রেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে বাণিজ্যিক ঝুঁকি কমেনি। ফলত সরবরাহের ছন্দে বিঘ্ন ঘটছে।
কতটা বাড়তে পারে? (India Economy)
যুদ্ধের জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি ৮৩–৮৪ ডলারের ঘরে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২০% বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাঙ্কগুলির পূর্বাভাস বলছে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দাম ১০০ ডলার ছুঁতে পারে, এমনকি চরম পরিস্থিতিতে ১৪০–১৫০ ডলারও অসম্ভব নয়। তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু সরবরাহ ব্যাহত হওয়াই নয়, উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও কাজ করছে। ইরাক, ওপেক-এর অন্যতম বড় উৎপাদক, মজুত সমস্যা ও নিরাপত্তা-ঝুঁকির কারণে উৎপাদন কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

সমস্যা কি শুধু তেল-গ্যাসে সীমাবদ্ধ? (India Economy)
একেবারেই নয়। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে শুধু জ্বালানি নয়, বিভিন্ন শিল্পপণ্যও যাতায়াত করে। ভারত থেকে রফতানিকৃত ওষুধ, এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর চিপ, পশ্চিম এশিয়ার রাসায়নিক সার সব কিছুর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। ইউরোপগামী জাহাজগুলিকে এখন বিকল্প দীর্ঘ পথ জিব্রাল্টার প্রণালী বা কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে হলে পরিবহণ ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়বে। ফলে গ্লোবাল সাপ্লাই চেনে চাপ তৈরি হবে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যে।
কোথায় সবচেয়ে বেশি চাপ? (India Economy)
ভারত তার প্রয়োজনীয় পেট্রোপণ্যের প্রায় ৮৫–৮৮% আমদানি করে। এর প্রায় অর্ধেক আসে হরমুজ় প্রণালী হয়ে। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও নির্ভরতা ৫০%–এর বেশি। চিন, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলির তুলনায় ভারতের কৌশলগত মজুত কম। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, ভারতের কাছে প্রায় ৭৪ দিনের তেল মজুত রয়েছে। তবে বেসরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশেষ রিজ়ার্ভ বাদ দিলে কার্যকর মজুত আরও কম হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে এই মজুত দ্রুত ফুরোবে।
এলএনজি-র সিঁদুরে মেঘ (India Economy)
তেলের তুলনায় এলএনজি-র ক্ষেত্রে ভারতের দুর্বলতা বেশি। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি রফতানিকারক Qatar যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উৎপাদন কমানোর ইঙ্গিত দিলে ভারতের গ্যাস সরবরাহে চাপ পড়বে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন—সব ক্ষেত্রেই এলএনজি অপরিহার্য। ইতিমধ্যে সরবরাহ ৩০–৪০% কমেছে বলে খবর। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সিএনজি ও পাইপড গ্যাসের দামে বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
টাকার উপর দ্বিমুখী চাপ (India Economy)
জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি বিল বাড়ে। প্রতি ১ ডলার তেলের দাম বাড়লে ভারতের বার্ষিক আমদানি ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। এতে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি বাড়ে। ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিদেশি লগ্নিকারীরাও পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে টাকার বিনিময়দর দুর্বল হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার দর ৯২ টাকার ঘরে পৌঁছানো অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। দুর্বল মুদ্রা আবার আমদানি ব্যয় আরও বাড়ায় একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।

মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে ভারতের জিডিপি-র তুলনায় কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি প্রায় ০.৩% বাড়তে পারে। মূল্যবৃদ্ধিও ০.২–০.৩% বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু পেট্রল-ডিজেল নয়, পরিবহণ খরচ বাড়ার মাধ্যমে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন: US Iran: ইরানে সামরিক অভিযান আমেরিকার, আত্মসমর্পণের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
কৌশলগত ভাবনা
হরমুজ় বন্ধ থাকলে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বা আমিরশাহির ফুজাইরাহ পাইপলাইন কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সেগুলির ক্ষমতা সীমিত। ফলে সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। ভারতের সামনে তাই তিনটি করণীয়, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ (রাশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা), নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। দীর্ঘমেয়াদে সৌর ও সবুজ হাইড্রোজেনের মতো বিকল্প শক্তির প্রসারই আমদানি-নির্ভরতা কমাতে পারে।



