Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: একসময় কলকাতা পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখার অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন দময়ন্তী সেন (Damayanti Sen)। প্রশাসনিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর নাম উচ্চারিত হত এক দুঁদে তদন্তকারী অফিসার হিসেবে। কিন্তু ২০১২ সালের বহুচর্চিত পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ মামলার পর ধীরে ধীরে প্রশাসনের মূলস্রোত থেকে অনেকটাই দূরে সরে যান তিনি। দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে আর দেখা যায়নি তাঁকে।
কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ফের নতুন করে কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন এই আইপিএস অফিসার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নারী নির্যাতন সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যে বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন, সেখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দময়ন্তী সেনকে। আর সেই সিদ্ধান্ত ঘিরেই নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনা।

গঠন হল বিশেষ তদন্ত কমিটি (Damayanti Sen)
সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, রাজ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির চেয়ারপার্সন করা হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়-কে। আর সদস্যসচিবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন দময়ন্তী সেন। সরকারি সূত্রের খবর, আগামী ১ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে এই কমিটি। তার আগে বিভিন্ন থানায় জমে থাকা FIR, GD, কমিশনের সুপারিশ, মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট এবং নারী ও শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, সন্দেশখালি, কসবা, বগটুই-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বহুচর্চিত ঘটনার অভিযোগও এই কমিটির নজরে আসতে পারে।
কে এই দময়ন্তী সেন? (Damayanti Sen)
দময়ন্তী সেন শুধুমাত্র একজন আইপিএস অফিসার নন, তিনি বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। Jadavpur University থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন তিনি। ১৯৯৬ ব্যাচের আইপিএস অফিসার হিসেবে পুলিশ পরিষেবায় যোগ দেন। কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে স্পেশাল কমিশনার পদেও ছিলেন। কলকাতার সেন্ট্রাল এবং নর্থ দুই গুরুত্বপূর্ণ জোনের ডেপুটি কমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন। তদন্ত দক্ষতা, প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জন্য পুলিশমহলে বরাবরই আলাদা পরিচিতি ছিল তাঁর।

পার্ক স্ট্রিট কাণ্ড: যে মামলায় বদলে যায় সবকিছু (Damayanti Sen)
২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে এক নারী গণধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন। পরে সেই নির্যাতিতার পরিচয় সামনে আসে সুজেট জর্ডন। ঘটনা সামনে আসতেই তোলপাড় শুরু হয় গোটা রাজ্যে। রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে ওঠে। সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এই ঘটনাকে ‘সাজানো’ বলেছিলেন বলে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় সরকারকে। কিন্তু সেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই তদন্তকারী অফিসার হিসেবে সামনে আসেন দময়ন্তী সেন। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি দ্রুত তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যান। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় তাঁর নেতৃত্বাধীন দল। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেও তদন্তের তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দময়ন্তী সেন স্পষ্ট করেন, নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। এই অবস্থানই কি তাঁর প্রশাসনিক জীবনে ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়? সেই প্রশ্ন আজও রাজনৈতিক মহলে ঘোরাফেরা করে।
কেন ‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়েছিলেন? (Damayanti Sen)
পার্ক স্ট্রিট মামলার পর থেকেই দময়ন্তী সেনকে আর বড় কোনও আলোচিত তদন্তে তেমনভাবে দেখা যায়নি। প্রশাসনিক মহলে তখন থেকেই জল্পনা শুরু হয় তাঁকে কি ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে? পরবর্তী সময়ে তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও সরকারি ভাবে কখনও এমন দাবি স্বীকার করা হয়নি। তবে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির বারবার অভিযোগ করেছে, পার্ক স্ট্রিট মামলায় সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত না হওয়াতেই প্রশাসনিকভাবে ‘সাইডলাইন’ করা হয়েছিল তাঁকে।
/indian-express-bangla/media/post_attachments/wp-content/uploads/2019/09/damayanti-759.jpg)
ফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় প্রত্যাবর্তন (Damayanti Sen)
দীর্ঘ সময় পর ফের রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তদন্তমূলক দায়িত্বে ফিরলেন দময়ন্তী সেন। ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্যের কয়েকটি ধর্ষণ মামলার তদন্তে বিশেষ কমিটি গঠন করলে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। রসিকা জৈন মৃত্যুরহস্য তদন্তেও তাঁর নাম সামনে আসে। পরে তাঁকে রাজ্য পুলিশের ADG (Training) পদে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি ADG ও IGP পদমর্যাদায় রয়েছেন। এবার শুভেন্দু সরকারের নতুন কমিটিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক বার্তা? (Damayanti Sen)
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নারী নিরাপত্তাকে অন্যতম বড় ইস্যু করেছিল। আরজি কর কাণ্ড, সন্দেশখালি-সহ একাধিক ঘটনা নিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল বিরোধীরা। ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের দিকেই কি এগোতে চাইছে নতুন সরকার? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দময়ন্তী সেনের মতো একজন পরিচিত ও অভিজ্ঞ অফিসারকে সামনে আনা আসলে সেই বার্তাই দিচ্ছে। কারণ, পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডে তাঁর ভূমিকা এখনও সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে রয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: Dilip Ghosh: “রামমোহন কলেজে রাম নেই”, দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক
রনো ফাইল খুললে কি সামনে আসবে নতুন সত্য?
নতুন কমিটি শুধু নতুন অভিযোগ নয়, পুরনো পেন্ডিং FIR, GD, কমিশনের সুপারিশ এবং অমীমাংসিত নারী নির্যাতনের মামলাগুলিও খতিয়ে দেখবে বলে জানিয়েছে সরকার। ফলে প্রশ্ন উঠছে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনও তথ্য কি এবার সামনে আসতে পারে? অতীতের বিতর্কিত তদন্ত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও কি নতুন আলোচনা শুরু হবে?



