Last Updated on [modified_date_only] by Shroddha Bhattacharyya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শেষ ১৪ মিনিটের আর্জেন্টাইন ঝরে (FIFA 2026 ARG vs EGY) ঢাকা পরল মিশরের পিরামিড! রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ৩-২ গোলে জিতে শেষ আটে আর্জেন্টিনা। মেসি ম্যাজিকে ত্রুটি ঢাকা পড়লেও স্কালোনির কপালে চিন্তার ভাঁজ!*
এভাবেও ফিরে আসা যায়! (FIFA 2026 ARG vs EGY)
এভাবেও ফিরে আসা যায়! হ্যাঁ যায়। তা আরও একবার প্রমাণ (FIFA 2026 ARG vs EGY) করল তারা। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২ গোলে পিছিয়ে। সকলেই ধরে নিয়েছিল বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে আরও এক ধ্রুবতারা খসে পড়া সময়ের অপেক্ষা। সেই একরাশ হতাশার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েই মহাকাব্য রচনা হল। শেষ ১৪ মিনিটে ৩ গোল করে বিদায় নিতে চলা দল পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। যেন খোদ ফুটবল ঈশ্বর রচিত চিত্রনাট্য! মঙ্গলবার আটলান্টায় প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচের শেষ ১৪ মিনিটে যা ঘটল, তা অতিমানবীয় না ম্যাজিক, তা নিয়ে চায়ের টেবিলে তর্কের ঝড় উঠতেই পারে।
মেসি ম্যাজিক! (FIFA 2026 ARG vs EGY)
লিওনেল মেসি মাঠে থাকলে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে মিশর। নির্ধারিত সময়ের আর মাত্র ১১ মিনিট বাকি। তাহলে নেইমার, রোনাল্ডোর পর মেসি (FIFA 2026 ARG vs EGY) নামক আরও এক মহাতারকার কান্নার বিদায়ের সাক্ষী হতে চলেছে বিশ্ব! এই প্রশ্ন যখন গোটা বিশ্বে মারাত্মক ভাবে চেপে বসেছে, তখনই ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠল আর্জেন্টিনা। ৭৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম গোল করে ব্যবধান কমালেন রোমেরো। তার ঠিক সাড়ে তিন মিনিটের মাথায় চলতি বিশ্বকাপে নিজের অষ্টম গোলটি করে সমতা ফেরালেন মেসি। আর অতিরিক্ত সময়ে (৯০+৩) শেষ আটের ছাড়পত্র এনে দিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। রূদ্ধশ্বাস ও নাটকীয় ম্যাচে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ আটে পৌঁছে গেল গতবারের চ্যাম্পিয়নরা। যা, যে কোনও থ্রিলারকেও হার মানাবে। নিজেদের উপর আস্থা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানা অদম্য লড়াই, হারের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে আনার দৃঢ় বিশ্বাসে ভর করেই এই মহাকাব্যিক জয় তুলে টানা দ্বিতীয়বার এবং সব মিলিয়ে চতুর্থবার বিশ্বকাপ জয়ের নজির গড়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল লা আলবিলেস্তেরা। হ্যাঁ, ম্যাচ শেষে মেসি কাঁদলেন। কিন্তু সেটা যুদ্ধ জয়ের আনন্দাশ্রু। বিদায়ের যন্ত্রণার নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কোনও দিন ০-২ গোলে পিছিয়ে থেকে জেতেনি আর্জেন্টিনা। এমনকি, ড্র পর্যন্ত করেনি। সে দিক থেকে দেখতে গেলে এটা আর্জেন্টিনার সেরা প্রত্যাবর্তন। আর মেসির পায়েই তা সম্ভব হল।
নাটকীয়তায় মোড়া ম্যাচের প্রথমার্ধ (FIFA 2026 ARG vs EGY)
নাটকীয়তায় মোড়া ছিল ম্যাচের প্রথমার্ধও। খেলা শুরুর আগে মিশরের কোচ হাসান হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, তাঁদের দলে ২৬ জন মেসি রয়েছেন। মিশরের খেলা দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছিল। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে মিশর। একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টাইন ডিফেন্সকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছেন মহম্মদ সালহারা। ১৫ মিনিটে তার সুফলও পায় পিরামিডের দেশ। ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা হাসানের ক্রসে হেডে গোল করে মিশরকে এগিয়ে দেন ইব্রাহিম।
গোল খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২১ মিনিটে নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকোকে বক্সের মধ্যে মিশরের ডিফেন্ডার ফাউল করায় পেনাল্টি দেন রেফারি। প্রত্যাশিতভাবেই শট নিতে যান মেসি। কিন্তু আবারও ভুল করলেন। গোলরক্ষকের বাঁ দিক দিয়ে দুর্বল শটে গোল করার চেষ্টা করেন এলএম টেন। কিন্তু সেই শট সহজে বাঁচিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মুস্তাফা শোবের। চলতি বিশ্বকাপে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার পেনাল্টি মিস করলেন মেসি। গ্ৰুপ পর্বেও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধেও পেনাল্টিতে গোলরক্ষকের বাঁদিকে শট নিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু বল বাইরে চলে যায়।
লজ্জার রেকর্ড! (FIFA 2026 ARG vs EGY)
এদিন গোল করে যেমন দলের হার বাঁচালেন, তেমনি লজ্জার রেকর্ডও গড়লেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। বিশ্বকাপে সব থেকে বেশি পেনাল্টি মিসের রেকর্ড করলেন মেসি। এই বিশ্বকাপের আগে মেসি ও ঘানার অসমো গিয়ানের সর্বাধিক ২টি করে পেনাল্টি মিসের রেকর্ড ছিল। এই বিশ্বকাপে জোড়া পেনাল্টি মিস (FIFA 2026 ARG vs EGY) করে সেই তালিকায় এককভাবে শীর্ষে উঠে এলেন মেসি। বিশ্বকাপে সর্বাধিক চারটি পেনাল্টি মিসের নজির গড়লেন এলএম টেন। এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপে আইসল্যান্ড ও ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি ফস্কেছিলেন মেসি।
প্রথমার্ধে কিছুটা মন্থর ফুটবল খেললেও গোলের সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ৩৮ মিনিটে ফ্রিকিক থেকে নেওয়া মেসির বাঁক খাওয়া শট বারে লেগে বেরিয়ে যায়। সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ম্যাকঅ্যালিস্টার ও আলভারেজ। মনে হচ্ছিল দিনটা আর্জেন্টিনার নয়। মেসিকে স্বাভাবিকভাবেই বোতল বন্দি করে রেখেছিল মিশর। তাঁর সঙ্গে সবসময় একজন মার্কার ছিলেন। তিনি বল ধরলেই মিশরের দু’জন ফুটবলার চলে আসছিলেন। ফলে মাঝে মাঝেই বলের দখল হারিয়ে ফেলছিলেন মেসি। গত কাতার বিশ্বকাপে এনজো, আলভারেজরা গোল করে মেসির চাপ কমিয়ে ছিলেন। কিন্তু এবার তাঁরা সেই ফর্মে নেই। তার উপর মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের যেন অভেদ্য প্রাচীর হয়ে উঠেছিলেন। একাধিকবার দুরন্ত সেভ করে দুর্গপতন রুখলেন। ফলে প্রথমার্ধে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়তে হয় স্কালোনির দলকে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে চাপ বাড়ালেও গোলের দরজা (FIFA 2026 ARG vs EGY) খুলতে পারছিলেন না মেসিরা। তারই মাঝে দ্বিতীয় গোল পেয়ে যায় মিশর। প্রতি আক্রমণ থেকে তিন পাসে আর্জেন্টিনার গোলে বল জড়িয়ে দিয়েছিলেন জিকো। কিন্তু তার আগেই লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করায় রেফারি গোল বাতিল করেন। তবে দ্বিতীয় গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি মিশরকে। এর কয়েক মিনিট পরই আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের ভুলে ২-০ এগিয়ে যায় মিশর। ৬৭ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি করেন সেই জিকো। বিতর্কিত সিদ্ধান্তে রেফারি আগের গোলটি বাতিল না করলে ৩-০ গোলে এগিয়ে যেতে পারত মিশর। তখন মনে হচ্ছিল মিশরের পিরামিডকে আর টপকাতে পারবে না আর্জেন্টিনা।
আরও পড়ুন: Bipadtarini Puja 2026: সংসারের মঙ্গল ও বিপদমুক্তির প্রার্থনায় কবে পালন করবেন বিপদতারিণী ব্রত?
কোচ স্কালোনি ৬৫ মিনিটে লাউতেরো মার্টিনেজ ও গঞ্জালেজকে (FIFA 2026 ARG vs EGY) নামাতেই ঘুরে যায় খেলা। মার্টিনেজ নামতেই ডান প্রান্তে সরে যান মেসি। আর রক্ষণে ভিড় বাড়াতে গিয়ে মেসিকেও ফাঁকা ছেড়ে দেয় মিশর। আর্জেন্টিনার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। ৭৯ মিনিটে মেসির ক্রসে হেডে গোল করে ব্যবধান কমালেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। তার পরে যেন রক্তের স্বাদ পেয়ে গেল আর্জেন্টিনা। সাড়ে তিন মিনিটের মাথায় ৮৩ মিনিটে আবারও মিশরের বক্সে ক্রস ভাসালেন মেসি।

মিশর ডিফেন্স সেই বল প্রতিহত করলে ফিরতি বলে জটলার মধ্যে থেকে জোরালো শট নেন মেসি। বল ক্রসবারে লেগে গোললাইন অতিক্রম করে যায়। ফলে ২-২ করে ফেলে আর্জেন্টিনা। তখনও নাটক বাকি ছিল। তৃতীয় গোল সম্পূর্ণ নিজেদের ভুলে খেল মিশর। গোল করতে মরিয়া সবাই আক্রমণে এগিয়ে যাওয়ার ফলে ডিফেন্সের ফাঁক তৈরি হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ৯৩ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে বল ধরে এগিয়ে ক্রস বাড়ান লাউতেরো মার্টিনেজ। গোটা ম্যাচে যাঁকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি সেই এনজো হেডে গোল করে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করে দেন। যদিও গোলটি হওয়ার আগে তাদের ফুটবলারকে ফাউল করা হয় বলে দাবি তোলেন মিশরের ফুটবলার, কোচ সাপোর্ট স্টাফরা। কিন্তু তাদের আবেদনে কর্ণপাত করে ভারের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেননি রেফারি। তার প্রতিবাদ করায় মিশরের এক সাপোর্ট স্টাফকে লাল কার্ড পর্যন্ত দেখান রেফারি। এবং কোচকেও দেখতে হয় হলুদ কার্ড। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে হারলেও এদিন মহম্মদ সালহা, ইব্রাহিম, জিকো, শোবেররা যে অনবদ্য ফুটবল খেললেন, তাতে সকলের মন জিতে নিয়েছেন। তাদের লড়াইকে কুর্নিশ।

ম্যাচ জয়ের পর মাঠেই শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন মেসি (FIFA 2026 ARG vs EGY) । পেনাল্টি মিসের লজ্জা রেকর্ড করার পাশাপাশি এদিন ভাল কিছু রেকর্ডও গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপের সর্বাধিক গোলের সংখ্যায় ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে ফারাক বাড়ালেন মেসি। তাঁর গোলের সংখ্যা ২১। এমবাপের ১৯। চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলও মেসির। ৮টি গোল করেছেন তিনি। এমবাপে এখনও পর্যন্ত করেছেন ৭ গোল। তাঁর সঙ্গে যুগ্মভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন সাত গোল করা নরওয়ের তারকা হাল্যান্ড। চলতি বিশ্বকাপের সব ম্যাচেই গোল করলেন মেসি। গত কাতার বিশ্বকাপ থেকে ধরলে বিশ্বকাপে টানা ন’ম্যাচে গোল করলেন মেসি, যে রেকর্ড কারও নেই। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি নকআউট ম্যাচও খেলে ফেলেছেন এলএম টেন।
শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোলে সব ত্রুটি ঢেকে ফেললেও রাউন্ড (FIFA 2026 ARG vs EGY) অব ৩২-তে কেপ ভার্দের পর এদিন মিশরও আর্জেন্টিনা ডিফেন্সের জরাজীর্ণতা আরও একবার সকলের সামনে বেআব্রু করে দিল। যা কোয়ার্টার ফাইনালে নামার আগে কোচ স্কালোনির রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নড়বড়ে ডিফেন্স নিয়ে মুখ লোকানোর জায়গা নেই। যেভাবে দু-দু’বার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পাশ দিয়ে মিশর গোল করে গেল, তাতেই সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। প্রতি আক্রমণ থেকে সালাহ, হাসান, জিকোরা যত বার আক্রমণ করলেন, আর্জেন্টাইন রক্ষণে ত্রাহি-ত্রাহি রব উঠল।
আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ ও আক্রমণের অবস্থাও তথৈবচ (FIFA 2026 ARG vs EGY) । বল ধরার লোক নেই। ডি’পল, ম্যাকঅ্যালিস্টাররা যেন ফরওয়ার্ড পাস খেলতেই ভুলে গিয়েছেন। মেসিকেই আক্রমণ তৈরি করতে হচ্ছে। গত বিশ্বকাপের ফর্মের ধারেকাছেও নেই আলভারেজ, এনজো। ফলে গোলের জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে মেসির দিকেই। তাই সামনে ফ্রান্স বা স্পেন পড়লে এই রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণ নিয়ে আর্জেন্টিনা কতটা সুবিধে করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। প্রতি ম্যাচেই মেসি উতরে দেবেন, এমনটা ভেবে থাকলে চরম ভুল করছে আর্জেন্টিনা। তাই শেষ আটের লড়াইয়ে নামার আগে এই দল নিয়ে অনেক খাটতে হবে স্কালোনিকে।


