Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে একটি দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করে আবারও কলকাতায় ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন (Taslima Nasrin)। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত বেদনা, নির্বাসনের অভিজ্ঞতা, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ। তাঁর দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের সময় যেমন তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়নি, তেমনি পরবর্তী তৃণমূল সরকারও তাঁর কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর বই প্রকাশের অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে, টেলিভিশন ধারাবাহিকের সম্প্রচার বন্ধ হয়েছে এবং একজন লেখক হিসেবে তাঁকে সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তসলিমার কথায়, একজন লেখকের বিরুদ্ধে এই ধরনের আচরণ শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়, বরং মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রশ্ন করার অধিকারের বিরুদ্ধেও অবস্থান।
বাংলার সঙ্গে তসলিমার সম্পর্ক (Taslima Nasrin)
বাংলাদেশের ময়মনসিংহে ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন তসলিমা নাসরিন। পেশায় চিকিৎসক হলেও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমেই তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেন। নারীর অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর লেখালেখি তাঁকে যেমন বিপুল পাঠকসমর্থন এনে দেয়, তেমনি তীব্র বিরোধিতার মুখেও ফেলে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘লজ্জা’ বাংলাদেশে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে প্রাণনাশের হুমকি ও একাধিক মামলার মুখে ১৯৯৪ সালে তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়। বহু বছর ইউরোপে থাকার পর বাংলা ভাষার কাছাকাছি থাকার আশায় তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। কিন্তু সেই অবস্থানও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
কলকাতা ছাড়ার প্রেক্ষাপট (Taslima Nasrin)
২০০৭ সালে কলকাতায় তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে তীব্র বিক্ষোভ ও অশান্তির ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তাঁকে কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি দীর্ঘদিন দিল্লিতে নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন এবং পরবর্তীতে ভারতও ছাড়েন। এরপর থেকে বহুবার তিনি কলকাতায় ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
তসলিমা এবং তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, বামফ্রন্ট সরকার তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাঁদের মতে, তাঁর আত্মজীবনীর একটি অংশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০০৭ সালের সহিংসতার সময় প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকেই কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করে। মৌলবাদী হুমকির মুখে একজন লেখকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। অন্যদিকে, তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তৃণমূল সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরার পথ সুগম হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তসলিমার অভিযোগ, তাঁর বই প্রকাশ অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা এসেছে এবং সরকার প্রকাশ্যে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেয়নি। তবে এ বিষয়েও সরকারের তরফে বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মন্তব্য (Taslima Nasrin)
নিজের সাম্প্রতিক বার্তায় তসলিমা নাসরিন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়েও মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে শুধু নতুন সরকার গঠনই হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষেরও প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি দাবি করেন, অনেক ভোটার ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি আগের সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন এছাড়া তিনি দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক প্রকল্পভিত্তিক রাজনীতি নিয়েও নিজের মত প্রকাশ করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, এগুলি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এই দাবিগুলি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান এবং ব্যাখ্যা ভিন্ন।
বাক্স্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় অনুভূতির বিতর্ক
তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে ভারসাম্য কোথায় স্থাপন করা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত। একই সঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার। যখন কোনো লেখকের বক্তব্য বা বইকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তখন রাষ্ট্রের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
তসলিমার প্রত্যাবর্তন কি শুধুই ব্যক্তিগত বিষয়?
তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরার ইচ্ছা নিছক ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় নয় এটি বহু মানুষের কাছে একটি প্রতীকী প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।কেউ মনে করেন, তাঁকে ফিরতে দেওয়া উচিত, কারণ একজন লেখকের নিরাপদ পরিবেশে বসবাস ও লেখালেখি করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।আবার অন্য একটি অংশের মত, তাঁর অতীতের কিছু লেখা এবং বক্তব্য এখনও সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রশাসনিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিকোণ (Taslima Nasrin)
ভারতের সংবিধান নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও বিদেশি নাগরিকের ভারতে বসবাসের অধিকার স্বয়ংক্রিয় নয়। তাঁদের ক্ষেত্রে ভিসা, আবাসনের অনুমতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বিভিন্ন রায়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের বলেই উল্লেখ করেছে।
আরও পড়ুন: Cancer Doubles: ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে ৩.৫ কোটি ক্যানসার রোগী! সতর্ক করল WHO, প্রতিরোধেই জোর
বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
বাংলা বহুদিন ধরেই সাহিত্য, যুক্তিবাদ, বিতর্ক এবং মুক্তচিন্তার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে মহাশ্বেতা দেবী বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্য বারবার স্বাধীন চিন্তার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এই প্রেক্ষাপটে তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরার প্রশ্ন শুধুমাত্র একজন লেখকের বাসস্থানের বিষয় নয়; এটি বাংলার সাংস্কৃতিক সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।



