Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর ও পান্না জেলার নদীতীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কয়েকজন আদিবাসী মহিলা (Madhya Pradesh)। তাঁদের প্রত্যেকের গলায় ঝুলছে ফাঁসের দড়ি। কয়েক মাস আগেই একই মহিলাদের দেখা গিয়েছিল প্রতীকী চিতার উপর শুয়ে প্রতিবাদ জানাতে। তাঁদের এই প্রতিবাদ কোনও নাটকীয়তা নয়, বরং এক গভীর অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ। তাঁদের বার্তা স্পষ্ট—যে উন্নয়ন তাঁদের ঘর, জমি, জঙ্গল, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে চায়, সেই জীবনের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়।
সরকারের স্বপ্নের উন্নয়ন (Madhya Pradesh)
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রায় ৪৪,৬০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন–বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের সূচনা করেন। এটি স্বাধীন ভারতের প্রথম বৃহৎ নদী-সংযোগ প্রকল্প হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল নির্মাণ করে কেন ও বেতওয়া নদীকে সংযুক্ত করা হবে।
সরকারের দাবি অনুযায়ী এই প্রকল্পের মাধ্যমে—
প্রায় ৬২ লক্ষ মানুষের পানীয় জলের ব্যবস্থা হবে। ১০.৬২ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ পৌঁছাবে। মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর, পান্না, টিকমগড়, নিওয়ারি, দামোহ, সাগর, দাঁতিয়া, শিবপুরী, বিদিশা ও রাইসেন জেলা উপকৃত হবে। পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের মাহোবা, ঝাঁসি, বান্দা ও ললিতপুর জেলাও সুবিধা পাবে। উৎপাদিত হবে ১০৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ এবং ২৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। কাগজে-কলমে এই প্রকল্প বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলসংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়নের ছবির অন্য পিঠে রয়েছে হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা।

উন্নয়নের বিনিময়ে হারিয়ে যাবে কত মানুষের পৃথিবী?
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হল দৌধন বাঁধ নির্মাণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ছত্তরপুরে প্রায় ৫,২৮৮টি পরিবার পান্নায় প্রায় ১,৪০০টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হবে। সব মিলিয়ে ২৪টি গ্রামের মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এঁদের অধিকাংশই গোন্দ ও কোল আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য, যাঁদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক কাঠামো বন ও নদীকেন্দ্রিক। তাঁদের কাছে বন শুধু জীবিকার উৎস নয়; বন তাঁদের পরিচয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা।
‘চিতা আন্দোলন’ থেকে ‘ফাঁস আন্দোলন’ (Madhya Pradesh)
প্রকল্প ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু হয়। প্রথমে ছিল, অবস্থান বিক্ষোভ মিছিল অবরোধ প্রশাসনিক ঘেরাও কিন্তু প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পরও যখন সমস্যার সমাধান হয়নি, তখন আন্দোলন আরও প্রতীকী এবং আবেগঘন রূপ নেয়। গত এপ্রিল মাসে আদিবাসী মহিলারা শুরু করেন ‘চিতা আন্দোলন’। প্রতীকী চিতায় শুয়ে তাঁরা জানান, জোরপূর্বক উচ্ছেদ তাঁদের কাছে মৃত্যুর সমান। এরপর নদীর ধারে গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে প্রতিবাদ আরও তীব্র বার্তা দেয়। তাঁদের প্রশ্ন, “উন্নয়নের জন্য যদি আমাদের জীবনই শেষ হয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়নের মূল্য কোথায়?”

প্রয়োজন সম্মানজনক পুনর্বাসন (Madhya Pradesh)
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার মূলত নগদ অর্থ দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। কিন্তু আদিবাসীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, জমির বদলে জমি, গ্রামের বদলে গ্রাম, জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে পুনর্বাসন তাঁদের মতে, একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা জমা করে কোনও মানুষের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি বা সামাজিক সম্পর্ক ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
আইনের দৃষ্টিতে আদিবাসীদের অধিকার (Madhya Pradesh)
ভারতের বনাধিকার আইন, ২০০৬ (Forest Rights Act, 2006) বনবাসী আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জমি ও বনসম্পদের উপর অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই আইনের উদ্দেশ্য, ঐতিহাসিক অবিচারের সংশোধন, বনবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা, বন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও Free, Prior and Informed Consent (FPIC) নীতি অনুযায়ী কোনও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনকে প্রভাবিত করবে এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তাঁদের স্বাধীন, পূর্ববর্তী এবং পূর্ণাঙ্গ সম্মতি গ্রহণকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়েই প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কেন মহিলারা? (Madhya Pradesh)
এই আন্দোলনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গ্রামের মহিলারা। কারণ তাঁরা জানেন, জমি হারানো মানে শুধু একটি বাড়ি হারানো নয়। জমি হারানো মানে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ হারানো, খাদ্যের নিরাপত্তা হারানো, সামাজিক সম্পর্ক হারানো, পূর্বপুরুষের স্মৃতি হারানো, সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানো। তাই তাঁরা নিজেরাই আন্দোলনের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ: চিরন্তন বিতর্ক (Madhya Pradesh)
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প অবশ্যই প্রয়োজন। জলসংকট দূর করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিঃসন্দেহে জাতীয় স্বার্থের বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, উন্নয়ন কি শুধুমাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায়? যদি কয়েক হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করতে হয়, বন ধ্বংস হয়, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি প্রাচীন সমাজ তার শিকড় হারায়, তবে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই? বিশ্বজুড়েই এখন উন্নয়নের ধারণা বদলাচ্ছে। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, পরিবেশ, মানবাধিকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন: Suvendu Adhikari: ১ সেপ্টেম্বর থেকে মাতৃভাষার মর্যাদা ফেরাতে বড় পদক্ষেপ শুভেন্দুর
একটি বৃহত্তর প্রশ্ন: উন্নয়ন কাদের জন্য?
ছত্তরপুর ও পান্নার এই আন্দোলন কেবল একটি স্থানীয় বিক্ষোভ নয়। এটি ভারতের উন্নয়ন মডেলকে ঘিরে এক গভীর প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি এমন উন্নয়ন চায়, যেখানে কিছু মানুষের জীবন বিসর্জন দিয়ে বহু মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে? নাকি এমন উন্নয়ন সম্ভব, যেখানে উন্নয়ন ও মানবিকতা পাশাপাশি চলতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রশাসনের নয়, সমগ্র সমাজের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।



