Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই কার্যত বিপর্যস্ত কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থা (App Cab Strike)। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার অ্যাপ ক্যাব ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে সিটু (CITU)-সমর্থিত অ্যাপ ক্যাব চালক সংগঠন। ভাড়া বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রাইভেট গাড়ি ও বাইকের ব্যবহার বন্ধ, সিএনজি-র সংকট নিরসন-সহ মোট ১১ দফা দাবিকে সামনে রেখেই এই কর্মসূচি পালন করছেন চালকেরা।
সোমবার সকালে অফিসমুখী যাত্রীদের কাছে অ্যাপ ক্যাব অন্যতম নির্ভরযোগ্য পরিবহণ। কিন্তু দিন শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বহু মানুষ মোবাইলে অ্যাপ খুলেও কোনও গাড়ি পাননি। অনেক ক্ষেত্রেই বুকিং নেওয়ার পর চালকেরা ট্রিপ বাতিল করেছেন, আবার কোথাও কোনও গাড়িই পাওয়া যায়নি। ফলে অফিসযাত্রী, শিক্ষার্থী, হাসপাতালগামী রোগী এবং দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রী—সবাইকে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছে।
কেন ধর্মঘট? জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ (App Cab Strike)
অ্যাপ ক্যাব চালকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে জ্বালানির দাম, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, বিমা, ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য খরচ একাধিকবার বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ভাড়া কাঠামোয় কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়েও পর্যাপ্ত আয় হচ্ছে না। চালকদের দাবি, যাত্রীদের দ্রুত ও নিরাপদ পরিষেবা দিতে গিয়ে তাঁদের নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটজনক হয়ে উঠছে। সেই কারণেই বহুদিন ধরে বিভিন্ন মহলে দাবি জানালেও কোনও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় তাঁরা শেষ পর্যন্ত ধর্মঘটের পথ বেছে নিয়েছেন।
চালকদের ১১ দফা দাবির মূল বিষয়গুলি (App Cab Strike)
সিটু-র তরফে প্রকাশিত দাবিপত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, সাধারণ এবং এসি লাক্সারি ক্যাবের ভাড়া দ্রুত পুনর্নির্ধারণ ও বৃদ্ধি। বাণিজ্যিক পরিবহণে প্রাইভেট বাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ির বেআইনি ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় পর্যাপ্ত সিএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা। বাণিজ্যিক গাড়ির দূষণ পরীক্ষায় মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক করার নিয়ম প্রত্যাহার। অ্যাপভিত্তিক পরিবহণ ব্যবস্থায় চালকদের স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন। চালকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ। চালকদের বক্তব্য, এই দাবিগুলি শুধু তাঁদের স্বার্থে নয়, ভবিষ্যতে যাত্রী পরিষেবার মান বজায় রাখার জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
মৌলালি থেকে পরিবহণ দপ্তরে মিছিল (App Cab Strike)
ধর্মঘটের পাশাপাশি সোমবার আন্দোলনকারীরা রাজপথেও নেমেছেন। সকাল ১১টা নাগাদ মৌলালির রামলীলা ময়দানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্যাব চালকেরা জমায়েত হন। এরপর সেখান থেকে মিছিল করে তাঁরা পরিবহণ দপ্তরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং নিজেদের ১১ দফা দাবির স্মারকলিপি জমা দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হোক। সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আবেদন জানানো হলেও বাস্তবিক কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এদিন আন্দোলনে বহু মহিলা চালকও অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য, পরিবার চালানোর পাশাপাশি গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। বাড়তে থাকা খরচের সঙ্গে বর্তমান আয়ের কোনও সামঞ্জস্য নেই।
হাওড়া ও শিয়ালদহে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ (App Cab Strike)
ধর্মঘটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই দুই স্টেশন থেকে অ্যাপ ক্যাব ব্যবহার করে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন। কিন্তু সোমবার সকাল থেকেই সেই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দূরপাল্লার ট্রেন থেকে নেমে বহু যাত্রী দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনও অ্যাপ ক্যাব পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে সরকারি ‘যাত্রী সাথী’ পরিষেবার অফলাইন কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়ান। যদিও যাত্রীদের ভিড়ের তুলনায় উপলব্ধ গাড়ির সংখ্যা ছিল খুবই কম। অনেকেই বিকল্প হিসেবে ট্যাক্সি, অটো বা বাস ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু অতিরিক্ত চাপের কারণে সেখানেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অতিরিক্ত ভাড়া ও উত্তেজনার অভিযোগ (App Cab Strike)
ধর্মঘটের আবহে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কয়েকজন চালক নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি টাকা দাবি করছেন। অন্যদিকে, কয়েকটি জায়গায় ধর্মঘট সমর্থকদের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে অংশ না নেওয়া চালকদের গাড়ি আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরে সরকারি ‘যাত্রী সাথী’র কর্মীদের সঙ্গে এক ক্যাব চালকের বচসা এবং হাতাহাতির পরিস্থিতিও তৈরি হয়, যা কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
অফিসযাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে (App Cab Strike)
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে ধর্মঘটের জেরে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন অফিসগামী মানুষ। অনেকেই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। কেউ বাস বা মেট্রোর ওপর নির্ভর করেছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু অফিসযাত্রী নন, হাসপাতালগামী রোগী, পরীক্ষার্থী, প্রবীণ নাগরিক এবং শিশুদের নিয়ে যাতায়াতকারী পরিবারগুলিও সমস্যার মুখে পড়েন। অনেকের মতে, বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা থাকলেও অ্যাপ ক্যাবের মতো সহজলভ্য পরিষেবা না থাকায় দিনের শুরুতেই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: Dharmatala Protest: ধর্মতলা কাণ্ডে পুলিশের বড় পদক্ষেপ, গ্রেফতার ১১ অভিযুক্ত
চালকদের বক্তব্য বনাম যাত্রীদের দুর্ভোগ
চালকদের দাবি, তাঁদের আন্দোলনের লক্ষ্য সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান আদায় করা। তাঁদের মতে, চালকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে অ্যাপ ক্যাব পরিষেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে যাত্রীদের বক্তব্য, চালকদের দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে পরিষেবা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। তাই দ্রুত সরকার, অ্যাপ সংস্থা এবং চালক সংগঠনগুলির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।



