Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কেটিভি বাংলা ডিজিটাল: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকার দেহ পুকুর থেকে উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে (Baruipur)। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নাবালিকাকে প্রথমে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী। দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কুলপি রোডে মৃতদেহ রেখে দীর্ঘক্ষণ অবরোধ ও বিক্ষোভ চলে। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং গোটা এলাকা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

গণপিটুনিতে অভিযুক্তের মৃত্যু (Baruipur)
ঘটনার জেরে জনতার ক্ষোভ এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, এক অভিযুক্তকে ধরে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। গুরুতর জখম অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সূর্যপুর পুলিশ ক্যাম্পে হামলার ঘটনাও ঘটে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের উপর চড়াও হয় বলে অভিযোগ। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, অবরোধ এবং পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অবরোধ প্রত্যাহার (Baruipur)
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতেই নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের পরই অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারীরা। পরে জানা যায়, মঙ্গলবার নির্যাতিতার পরিবারকে ভবানীভবনে ডেকে পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী, যেখানে পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তদন্তের অগ্রগতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

রাতভর পুলিশের অভিযান (Baruipur)
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তে নামে বারুইপুর থানার পুলিশ। রবিবার সন্ধ্যায় প্রথমে দু’জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর রাতভর তল্লাশি চালিয়ে আরও একজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে এই মামলায় মোট তিনজন গ্রেফতার হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি, অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আরও তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বারুইপুর থানার পুলিশের পাশাপাশি অভিযানে অংশ নেন স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর সদস্যরাও। পুলিশের দাবি, তদন্তের স্বার্থে একাধিক জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং বাকি অভিযুক্তদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
অভিযুক্তদের জেরায় নতুন দাবি (Baruipur)
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের রাতভর জেরা করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় এক অভিযুক্ত দাবি করেছে, নাবালিকাকে অপহরণ করে তাঁর বাবার কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা ছিল। সেই উদ্দেশ্যেই তাকে আটক করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তদন্তে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, তাঁদের কাছে কোনও মুক্তিপণের ফোন বা বার্তা আসেনি। ফলে অভিযুক্তদের বক্তব্য নিয়ে পুলিশের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হতে পারে। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ধৃতদের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানানো হতে পারে।
বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন (Baruipur)
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিনাকী দত্তের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। এই দল ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছে। ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ—সবকিছুর ভিত্তিতেই তদন্ত এগোচ্ছে।
১৬৩ ধারা জারি, কড়া নিরাপত্তায় বারুইপুর
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর এবং সোনারপুর থানা এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-এর ১৬৩ ধারা জারি করেছে পুলিশ। এর ফলে ওই এলাকাগুলিতে জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সোমবার সকাল থেকেই এলাকায় বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। চলছে লাগাতার টহলদারি। বাইরের কাউকে সহজে এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। গড়িয়া ঢালাই ব্রিজ থেকে বিভিন্ন গাড়ির উপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে, যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।

রাজনৈতিক মহলে তৎপরতা (Baruipur)
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। কালীঘাট তৃণমূলের প্রতিনিধিদল বারুইপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিনিধিদলে রয়েছেন প্রতিমা মণ্ডল, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেনসহ একাধিক নেতা-নেত্রী। অন্যদিকে, ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকিও নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ফোনে মৃতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানান। পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভিডিও কলে নির্যাতিতার মায়ের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। তিনি প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার কথাও জানান।
আরও পড়ুন: Jagannath Dev Puja: কোন ফুলে সন্তুষ্ট জগন্নাথ দেব?
অন্যদিকে সাংসদ সায়নী ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে “নারকীয়” বলে উল্লেখ করে গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তদন্ত নিয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করেন।
তিনটি পৃথক মামলা রুজু
এই ঘটনায় বারুইপুর থানার পুলিশ মোট তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করেছে। প্রথম মামলাটি নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে। দ্বিতীয় মামলাটি সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, পুলিশের উপর হামলা, অবরোধ এবং ভাঙচুর সংক্রান্ত। তৃতীয় মামলাটি এক অভিযুক্তকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি মামলার তদন্ত পৃথকভাবে এগোনো হচ্ছে এবং প্রত্যেক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবারের একটাই দাবি—দোষীদের ফাঁসি
নির্যাতিতার পরিবার স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কোনও রাজনৈতিক আশ্বাস নয়, প্রকৃত বিচার চায়। পরিবারের দাবি, যারা এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক। নাবালিকার মায়ের কান্নায় বারবার উঠে এসেছে একটাই আবেদন, “আমার মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার চাই।”

আরও পড়ুন: Diabetes Cure Temple: মন্দিরে গেলেই সারবে সুগার! কোথায় জানেন?
তদন্তের দিকে নজর রাজ্যের
বারুইপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধুমাত্র দক্ষিণ ২৪ পরগনা নয়, গোটা রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে পুলিশের দ্রুত তদন্ত ও গ্রেফতারি অভিযান, অন্যদিকে জনরোষ, রাজনৈতিক তৎপরতা এবং প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলার ইস্যু হয়ে উঠেছে।



