Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতার বইপাড়ার অপর নাম কলেজ স্ট্রিট। যদি কোন জায়গাকে শহরের বুদ্ধিবৃত্তির কেন্দ্র বলা যায়, তাহলে তা হবে এই কলেজ স্ট্রিট, বইপ্রেমীদের জন্য এটি যেন ইডেন গার্ডেন। এখানে সময়ের চাকা শুধু আগামীর দিকে এগিয়ে যায়, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে, স্বপ্ন সত্যির অঙ্গীকার হয়। কলেজ স্ট্রিট শুধুমাত্র একটি অঞ্চলের নাম নয়। সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠেছে বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে জানা যাবে, অনেক সাহিত্যিক, লেখক ও প্রকাশকের আঁতুড় ঘর এই স্থান। লেখাপড়া আর আড্ডায় কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের সঙ্গে প্রায় সমস্ত মানুষের এক অলিখিত সম্পর্ক রয়েছে অনন্তকাল ধরে। বইয়ের গন্ধ রয়েছে বাঙ্গালীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বর্তমান সময়ের তা কতটা প্রযোজ্য, সেই বিষয়ে কিছু মানুষের হয়ত সন্দেহ থেকেই যায়। ‘রিল’ আর ‘রিয়েল’ লাইফের তফাৎ কি আজকের মানুষ বোঝে? নাকি সবটাই সময়ের দোষ!

ব্যবসায়ীদের মনে প্রশ্ন (College Street)
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা কলেজ স্ট্রিট শুধু একটি রাস্তার নাম নয়, এটি বাঙালির শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক জীবন্ত ইতিহাস। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পুরনো বইয়ের বাজার হিসেবে পরিচিত এই বইপাড়া বহু প্রজন্মের ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিক্ষক ও বইপ্রেমীদের কাছে এক আবেগের নাম। কিন্তু সেই ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিটেই হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়েছে উচ্ছেদের আতঙ্ক। গুঞ্জন উঠেছে, ফুটপাতে রাখা বই সরাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের মনে প্রশ্ন—তাহলে কি এবার বইপাড়াতেও চলবে বুলডোজার (College Street)?
‘দামে কম মানে ভালো’ (College Street)
ছোটবেলায় আমাদের মা ঠাকুমারা বলতেন, ‘বই মাটিতে রাখতে নেই, তাহলে বিদ্যা চলে যায়…’। কিন্তু কলেজস্ট্রিটে হাজার হাজার বইয়ের ঠিকানা মেলে সেই রাস্তায়, যে রাস্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যস্ততা আনাগোনা করে চলেছে। বছরের ওই তিনটে দিনে সস্তার বইমেলার সন্ধান পায় অনেকে, সন্ধান নয় বরং অপেক্ষা করে অধীর আগ্রহে। আপনার ভাগ্য যদি ভালো থাকে তাহলে, ‘দামে কম মানে ভালো’ বই আপনিও পেয়ে যেতে পারেন।
আচমকা গুজবে উত্তাল বইপাড়া (College Street)
গত কয়েকদিন ধরে কলেজ স্ট্রিটের বিভিন্ন বই ব্যবসায়ীর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, কলকাতা পুরসভার কয়েকজন কর্মী এসে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে রাস্তার উপর বই রাখা যাবে না। যদিও কোনও লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি, তবুও এই মৌখিক নির্দেশকে ঘিরেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান এবং বেআইনি দখলদারি সরানোর ঘটনাগুলি সামনে আসার পর থেকেই কলেজ স্ট্রিটের ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করতে শুরু করেন যে তাঁদেরও হয়তো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

মানববন্ধনে প্রতিবাদ, স্পষ্ট আশ্বাসের দাবি (College Street)
বুধবার দুপুরে পরিস্থিতি আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। সম্ভাব্য উচ্ছেদের প্রতিবাদে কলেজ স্ট্রিটে মানববন্ধন করেন বই ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষ। তাঁদের মূল দাবি ছিল একটাই কলকাতা পুরসভা স্পষ্টভাবে জানাক যে বইপাড়ায় কোনও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে না। কারণ শুধুমাত্র কয়েকশো দোকান নয়, এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা (College Street)।
“২৬ বছর ধরে ব্যবসা করছি, উচ্ছেদ হলে কোথায় যাব?”
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁদের বক্তব্যে। বই ব্যবসায়ী দেবাশিস বিশ্বাস জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে পুরসভার কয়েকজন কর্মী এসে রাস্তার উপরে রাখা বই সরানোর কথা বলেন। এরপর তিনি নিজের সমস্ত বই রাস্তার ধারের অংশ থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমি ২৬ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। হঠাৎ যদি উচ্ছেদ হয়ে যাই, তাহলে কোথায় যাব জানি না। আমরা চাই পুরসভা স্পষ্টভাবে জানাক যে এখানে কোনও বুলডোজার চলবে না।” এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ব্যবসায়ীদের আতঙ্কের মূল কারণ কোনও লিখিত নির্দেশ নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
কলেজ স্ট্রিট কেন শুধু বাজার নয়, এক ঐতিহ্য
কলেজ স্ট্রিটের গুরুত্ব শুধুমাত্র ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃত কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক কফি হাউস সমস্ত কিছু মিলিয়ে এই অঞ্চল বাঙালির শিক্ষাজগতের কেন্দ্রবিন্দু। এখানকার ফুটপাতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বইয়ের দোকানগুলি বহু দশক ধরে ছাত্রছাত্রীদের সুলভ মূল্যে বই সরবরাহ করে আসছে। বিরল বই, পুরনো সংস্করণ, গবেষণামূলক গ্রন্থ কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির বই সবকিছুর জন্যই কলেজ স্ট্রিটের কোনও বিকল্প নেই। তাই এই বাজারের অস্তিত্ব নিয়ে সামান্য প্রশ্নও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।

পুরসভার অবস্থান কী? (College Street)
উচ্ছেদ নিয়ে যখন জল্পনা তুঙ্গে, তখন পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে সামনে আসেন কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কলেজ স্ট্রিটের বই ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করার কোনও পরিকল্পনা কলকাতা পুরসভার নেই। এমন কোনও নির্দেশিকা জারি করা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্যবাহী বইপাড়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, যদি কেউ উচ্ছেদ সংক্রান্ত কোনও ভুয়ো নোটিশ পান বা মৌখিক নির্দেশের কথা শুনে থাকেন, তাহলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
আতঙ্কের নেপথ্যে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান
হাওড়া স্টেশন, শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন এলাকা এবং কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি দখলমুক্তকরণ অভিযান চালানো হয়েছে। বহু অবৈধ নির্মাণ ও ফুটপাত দখল সরানো হয়েছে বুলডোজার ব্যবহার করে। এই ঘটনাগুলির প্রভাবই কলেজ স্ট্রিটের ব্যবসায়ীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কারণ তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন, একই ধরনের অভিযান যদি বইপাড়ায় চালানো হয়, তাহলে কয়েক দশকের পুরনো ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
বইয়ের ব্যবসা অন্য সব ব্যবসার থেকে আলাদা
বই ব্যবসায়ীদের মতে, বই বিক্রি কোনও সাধারণ পণ্য বিক্রির মতো নয়। একটি বইয়ের দোকানে হাজার হাজার বই বিভাগ অনুযায়ী সাজিয়ে রাখতে হয়। পাঠকদের বই খুঁজে পেতে পর্যাপ্ত জায়গা দরকার হয়। ফুটপাতের এই দোকানগুলির নিজস্ব কাঠামো ও বিন্যাস রয়েছে। হঠাৎ করে জায়গা সংকুচিত করে দিলে বা দোকান সরিয়ে দিলে বই সংরক্ষণ, প্রদর্শন এবং বিক্রির পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। এর ফলে শুধু ব্যবসায়ী নয়, পাঠকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আরও পড়ুন: Pahalgam Pak: পহেলগাম হামলায় পাক যোগ! ৯/১১ হামলায় যুক্ত ব্যাঙ্কের নাম এল তদন্তে
আপাতত স্বস্তি, তবুও কাটছে না উদ্বেগ
সূত্রের খবর, পুরসভার আশ্বাসে আপাতত কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কলেজ স্ট্রিটে। তবে ব্যবসায়ীদের একাংশ এখনও লিখিত নিশ্চয়তা চাইছেন। তাঁদের বক্তব্য, মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে সরকারি নথিভুক্ত ঘোষণা বেশি ভরসা জোগাবে। বর্তমানে কোনও উচ্ছেদ নোটিশ জারি হয়নি এবং কলকাতা পুরসভা বইপাড়া উচ্ছেদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে, শহরের এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে ঘিরে মানুষের আবেগ কতটা গভীর।
ভেসে আসে কাগজের পাতার শব্দ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, লিও তলস্তোয় (রাশিয়ার উপন্যাসিক), জে. কে রয়েলিং (হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা), হারু কি মুরাকামি (জাপানি লেখক), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সত্যজিৎ রায় ( ফেলুদা সিরিজ, প্রফেসর শঙ্কু), শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (ব্যোমকেশ সমগ্র), অগাস্টা ক্রিস্টি– সমস্ত লেখকের বইয়ের সন্ধান মিলে এই এক জায়গায়। কলেজ স্ট্রিট নামটা শুনলে কানে ভেসে আসে কাগজের পাতার শব্দ, চোখে পড়ে পুরনো ধূসর তাক, যা দেশি-বিদেশি ভিন্ন রকমের বইয়ে ভর্তি। আর মন চলে যায় সেই আড্ডা টেবিলে কফি হাউসে, যেখানে এক কাপ চায়ের সঙ্গে আলোচনা হয় জীবন বনাম সাহিত্য, শিল্প ও শিল্পীর আদলে রাজনীতি ও প্রেম এবং থিয়েটারের নানা বিষয়।



