Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দমদমের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে অবস্থিত ঐতিহাসিক গৌরীপুর জামে মসজিদ (Dum Dum Airport), যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামে অধিক পরিচিত, তাকে ঘিরে বহু দশকের জটিলতা এবার নতুন মোড় নিল। শনিবার থেকে বিমানবন্দরের ভিতর দিয়ে মসজিদে প্রবেশের জন্য দেওয়া এন্ট্রি পাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আপাতত মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায়ও স্থগিত রাখা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা মসজিদ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং মসজিদ কমিটির মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠকের পরই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে বিধায়ক সৌরভ শিকদার (Dum Dum Airport)
শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিধায়ক সৌরভ শিকদার। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা, মসজিদ কমিটির সদস্য এবং নামাজ পড়তে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অধিকাংশ মুসল্লিই প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। তিনি আরও বলেন, এই সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে কেউ যেন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্ররোচনা সৃষ্টি না করেন, সেই আবেদনও তিনি সকলের কাছে জানিয়েছেন।
১৩৬ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে বাঁকড়া মসজিদ
গৌরীপুর জামে মসজিদের ইতিহাস প্রায় ১৩৬ বছরের পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই মসজিদ। বিশেষত্ব হল, মসজিদটি বর্তমানে দমদম বিমানবন্দরের সুরক্ষিত এলাকার ভিতরে অবস্থান করছে। ফলে সাধারণ মানুষকে সেখানে পৌঁছতে হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হত। বিরাটি সংলগ্ন বাঁকড়া এলাকার একটি নির্দিষ্ট গেট দিয়ে আধার কার্ডসহ পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হত। এরপর বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে মসজিদে পৌঁছতে হতো।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ (Dum Dum Airport)
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলির মধ্যে অন্যতম দমদম বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। বিমানবন্দরে বর্তমানে দুটি রানওয়ে রয়েছে। প্রধান রানওয়েটি দিয়েই অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান ওঠানামা করে। দ্বিতীয় রানওয়েটি তুলনামূলক ছোট হলেও সেটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান রানওয়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হলে দ্বিতীয় রানওয়েটিকে সম্পূর্ণ সক্ষম করে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু রানওয়ের একেবারে নিকটবর্তী এলাকায় বাঁকড়া মসজিদের অবস্থানের কারণে সম্প্রসারণের কাজ বারবার বাধার মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন সাধারণ মানুষের বিমানবন্দরের উচ্চ-নিরাপত্তা বলয়ের ভিতরে প্রবেশ করাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছিল।
বহু দশকের আলোচনার পর বাস্তবায়নের পথে সিদ্ধান্ত
বাঁকড়া মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি নতুন নয়। গত কয়েক দশক ধরেই এই বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং ধর্মীয় ভাবাবেগ এই চারটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করার চেষ্টা চলেছে দীর্ঘদিন। তবে নানা প্রশাসনিক, আইনি এবং সামাজিক কারণে এতদিন কোনও স্থায়ী সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক স্তরে একাধিক বৈঠক হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে গতি পায়। রাজ্য প্রশাসন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু হয়।

প্রশাসনিক বৈঠকের পর শুরু হল কার্যকরী পদক্ষেপ
ইতিমধ্যেই উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দপ্তরে বিধায়ক, প্রশাসনের আধিকারিক এবং মসজিদ কমিটির সদস্যদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর একটি বিশেষজ্ঞ দল মসজিদ এলাকা পরিদর্শন করে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর বিমানবন্দর নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকের পরই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিমানবন্দরের ভিতরে প্রবেশের এন্ট্রি পাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং আপাতত মসজিদে নামাজ আদায়ও স্থগিত রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তায় মোতায়েন অতিরিক্ত পুলিশ (Dum Dum Airport)
এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তার জন্য মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও বজায় রাখা হয়েছে যাতে কোনও ধরনের বিভ্রান্তি বা উত্তেজনা ছড়িয়ে না পড়ে।
আরও পড়ুন: Green Churi: শ্রাবণে সবুজ কাচের চুড়ি পরার রীতি কেন?
উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চ্যালেঞ্জ
দমদম বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে প্রায় দেড় শতাব্দী প্রাচীন একটি ধর্মীয় স্থানের ঐতিহাসিক ও আবেগগত মূল্যও কম নয়। তাই প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল একদিকে বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখা।



