Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার গ্রামীণ লোকাচারে শিব কোনও অলঙ্কৃত, রাজকীয় দেবতা নন (Folk Festival)। তিনি ঘরহীন, সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষের আপনজন। পুরাণে শিব স্বয়ম্ভূ, আদি এবং দেবাদিদেব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তাঁর রূপ ও চরিত্র অঞ্চলভেদে বদলে গেছে। উত্তর ও মধ্য ভারতে যে শিবের গাঢ় নীল বর্ণ, আর্য-গ্রীক সুলভ পৌরাণিক অবয়ব দেখা যায়, বাংলায় এসে তিনি হয়ে ওঠেন ভিন্ন মাটির কাছাকাছি, লোকজ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। বাংলায় শিবের উপাসনা মূলত জীবনযাপন ও আচরণগত দিক থেকে অন্যান্য দেবদেবীর থেকে আলাদা। এখানে শিব তপস্বী, গৃহত্যাগী, আবার কখনও কৃষকের দেবতা, কখনও শ্মশানের অধিপতি। এই বহুমাত্রিক চরিত্রই তাঁকে লোকাচারের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে।

অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর শৈব প্রতিরোধ (Folk Festival)
গাজন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন বৈদিক ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর উপাসনায় অংশগ্রহণ করেছে, তখন তার মধ্য দিয়ে নিজেদের সামাজিক অস্তিত্ব ও অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। সেই প্রচেষ্টারই এক শৈল্পিক ও ধর্মীয় রূপ হলো শিবের গাজন। ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারার সমান্তরালে যে অন্ত্যজ শৈব উপাসনার ধারা গড়ে উঠেছে, গাজন তার সবচেয়ে জীবন্ত প্রকাশ। এখানে শিব কোনও দূরবর্তী দেবতা নন, তিনি সহযাত্রী যন্ত্রণার, দারিদ্র্যের এবং সামাজিক বঞ্চনার সঙ্গী।

উপাসনা থেকে নাট্যরূপ (Folk Festival)
গাজনের আচার-অনুষঙ্গেই জন্ম নিয়েছে এক বিশেষ নৃত্যধর্মী উপস্থাপনা, যা বাংলার কিছু অঞ্চলে ‘অঘোরী নৃত্য’ নামে পরিচিত। এই নৃত্য ভয়ংকর বা রহস্যময় মনে হলেও তার গভীরে রয়েছে আত্মসংযম, ত্যাগ এবং সমাজের বিধিনিষেধকে অতিক্রম করার দর্শন। শরীরকে মাধ্যম করে, কখনও রক্তপাত, কখনও আগুন বা কাঁটার মধ্য দিয়ে চলার মাধ্যমে অঘোরীরা শিবের তপস্যার প্রতিরূপ হয়ে ওঠেন। এই নৃত্য কোনও বিনোদনমূলক শিল্প নয়; এটি একাধারে আধ্যাত্মিক সাধনা ও লোকনাট্যের রূপ।
লোকসংস্কৃতির উত্তরাধিকার (Folk Festival)
কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের অকালপ্রয়াণের পরে বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারায় এক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। সেই শূন্যতা পূরণ করার প্রয়াসেই ‘সারেগামাপা’-র নির্দেশক অভিজিৎ সেন এবং সঙ্গীত পরিচালক রথিজিৎ ভট্টাচার্য লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় সহজিয়ার দেব চৌধুরীকে গ্রুমার ও মেন্টর হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। লোকসংস্কৃতিকে কেবল গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে তার পারিপার্শ্বিক আচার, নৃত্য ও জীবনদর্শনকে তুলে ধরাই দেব চৌধুরীর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে লোকসংস্কৃতি একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা।
কান্দির অঘোরী নৃত্য (Folk Festival)
এ বারের ‘সারেগামাপা’-র মঞ্চে ত্রিপুরার অনন্যা এবং অসমের পাপিয়ার যৌথ গানের দৃশ্য-অনুষঙ্গে দেব চৌধুরী নিয়ে আসেন মুর্শিদাবাদের কান্দি অঞ্চলের এক অঘোরী নৃত্যদল। এই দলটি ইতিমধ্যেই কুম্ভমেলার সময়ে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। গ্রামের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই আচারনির্ভর নৃত্য যখন ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা নতুন প্রজন্মের কাছে এক বিস্ময়ের বিষয় হয়ে ওঠে লোকাচার যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার প্রমাণ দেয় এই অঘোরী নৃত্য।
আরও পড়ুন: Sweater Tips: শীতে একই সোয়েটার কতদিন পরা উচিত?
মঞ্চে লোকাত্মার পুনরাবিষ্কার
এই প্রথমবার কলকাতায়, রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে সহজিয়া উৎসব ২০২৫-এর মঞ্চে পারফর্ম করে গেল কান্দির এই অঘোরী নৃত্যদল। শহুরে দর্শকের সামনে গ্রামীণ শৈব উপাসনার এমন প্রত্যক্ষ উপস্থাপনা এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এই প্রসঙ্গে দেব চৌধুরীর বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, ‘আমরা এই ফর্মটাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। দর্শকদের পছন্দ হয়েছে দেখে আমরা খুশি।’ এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে লোকসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ নয়, বরং সম্মানজনক উপস্থাপনার মাধ্যমে তার জীবন্ত ধারাকে বহমান রাখা।



