Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: রঙিন শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ আর তালে তালে গরবা নাচ—প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, নবরাত্রির উৎসবে মেতেছেন একদল মহিলা (Gujarat Tradition)। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই ধরা পড়ে, শাড়ির আড়ালে রয়েছেন পুরুষরা। গুজরাটের আহমেদাবাদের শাহপুর এলাকার ‘সাদু মাতা নি পোল’-এ প্রতি বছর নবরাত্রির অষ্টমীর রাতে দেখা যায় এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য। প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে সাদু মাতার স্মরণে নারীবেশ ধারণ করেন বারোট সম্প্রদায়ের পুরুষরা।

প্রায়শ্চিত্তের আচারে সামিল বিভিন্ন সম্প্রদায় (Gujarat Tradition)
রবিবার রাতে মন্দির চত্বরে জড়ো হন বারোট সমাজের অন্তত ৪০ জন পুরুষ। স্ত্রীর হাতে শাড়ি পরে, কপালে সিঁদুরের টিপ লাগিয়ে তাঁরা গরবা নাচে অংশ নেন। এই আচার কেবল একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রীতির নজির গড়ে মুসলিম সমাজ-সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ২৫ থেকে ৩০ জন পুরুষও এতে অংশ নেন। ৬০ বছরের সতীশ বারোটের মতো অনেকে কয়েক দশক ধরে এই রীতি পালন করছেন। নতুন প্রজন্মকেও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করাতে পরিবার-সহ হাজির হন বহু মানুষ।
সাদু মাতার আত্মত্যাগের মর্মান্তিক ইতিহাস (Gujarat Tradition)
এই প্রথার নেপথ্যে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক লোকগাথা। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে সাদু মাতার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এক স্থানীয় শাসক তাঁকে রাজদরবারে হাজির করার নির্দেশ দেন। তাঁকে রক্ষা করতে বারোট সম্প্রদায়ের পুরুষরা রাজার সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সম্মান রক্ষার জন্য চরম আত্মত্যাগের পথ বেছে নেন সাদু মাতা। লোককথা অনুযায়ী, প্রথমে তিনি নিজের কন্যা অজিবাকে হত্যা করেন, পরে স্বামী হাথিসিংহ বারোটকে তাঁর শিরশ্ছেদ করার অনুরোধ জানান।
অপরাধবোধ থেকেই জন্ম প্রায়শ্চিত্তের রীতি (Gujarat Tradition)
সাদু মাতাকে রক্ষা করতে না পারার অনুশোচনা বারোট সম্প্রদায়ের লোকবিশ্বাসে গভীর ছাপ ফেলে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে বংশবৃদ্ধিতে বাধা ও পুরুষদের অকালমৃত্যুর মতো দুর্ভাগ্যকে ওই ঘটনার অভিশাপ বলে মনে করা হতো। সেই সংকট থেকে মুক্তি এবং সাদু মাতার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর স্মৃতিবেদির সামনে শপথ নেন সম্প্রদায়ের পুরুষরা। নারীদের পোশাক পরে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই বিশেষ প্রায়শ্চিত্তের আচার।
পুরুষতান্ত্রিক অহং ভেঙে শ্রদ্ধা নিবেদনের বার্তা
এই রীতির বিশেষত্ব শুধু নারীবেশ ধারণে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুশোচনা ও শ্রদ্ধার অনুভূতিতে। পুরুষের পৌরুষের প্রচলিত ধারণাকে পাশে সরিয়ে রেখে তাঁরা স্বীকার করেন অতীতের ব্যর্থতা এবং এক নারীর আত্মত্যাগের গুরুত্ব। যদিও এই ইতিহাস মূলত লোকবিশ্বাস ও প্রজন্মান্তরে প্রচলিত কাহিনির ওপর নির্ভরশীল, তবু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এর আবেগ ও তাৎপর্য গভীর।
আরও পড়ুন: South 24 Parganas: আট মাসের ব্যবধানে ফের নাজিরাবাদের মোমো গোডাউনে আগুন!
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে রয়েছে ঐতিহ্য
সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ, বদলেছে উৎসব উদ্যাপনের ধরন। কিন্তু আহমেদাবাদের ‘সাদু মাতা নি পোল’-এ আজও অটুট রয়েছে এই প্রথা। নবরাত্রির অষ্টমীর রাতে শাড়ি পরে গরবা নাচের মধ্য দিয়ে পুরুষেরা স্মরণ করেন সাদু মাতার আত্মত্যাগ এবং প্রার্থনা করেন পরিবারের ও সমাজের মঙ্গল। তাঁদের কাছে এটি নিছক উৎসবের অংশ নয়, বরং ইতিহাস, অনুশোচনা, বিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত ঐতিহ্য—যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলেছে এক অনন্য সামাজিক স্মৃতি।



