Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলায় হিন্দু সমাজে মাংস ভক্ষণের নিয়ম ছিল কঠোর (Kasai Kali)। সাধারণ বাজারের দোকান থেকে কেনা মাংস হিন্দুরা গ্রহণ করতেন না, কারণ তা ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘অশুচি’ বা ‘বৃথা মাংস’ বলে গণ্য হতো। শুধুমাত্র দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া পশুর মাংসই ছিল ‘শুদ্ধ’ ও ‘প্রসাদ’। তাই সাধারণ মানুষ কেবলমাত্র পুজো বা উৎসবের সময়ে মাংস খেতে পারতেন। কিন্তু সমস্যা ছিল বলি দেওয়ার খরচ। প্রতিদিন বা ঘন ঘন বলি দেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে বাঙালির ভোজনরসিকতার ইতিহাসে এক অদ্ভুত বাধা এসে দাঁড়ায় উৎসবের বাইরে মাংস খাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ধর্ম ও ব্যবসার এক ব্যতিক্রমী সংযোগ (Kasai Kali)
এই সমস্যারই সুরাহা করেন বউবাজারের মলঙ্গা লেনের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি ইতিহাসে পরিচিত ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে। তার বাবার কলেজ স্ট্রিটে ছিল একটি পুরনো মাংসের দোকান। বংশপরম্পরায় দোকানের ভার যখন তার হাতে এল, তখন তিনি বুঝলেন ধর্মীয় প্রথার কারণে ব্যবসা যেমন সীমিত, তেমনি বাঙালির রসনাতৃপ্তিতেও বাধা। তখনই তিনি এক নতুন পথের সূচনা করেন। গোপাল পাঁঠা নিজের দোকানেই কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার ব্যবস্থা করেন। দেবীকে সাক্ষী রেখে দোকান থেকে বিক্রি হতে থাকে ‘প্রসাদী মাংস’। এর ফলে মাংস আর ‘বৃথা’ রইল না তা হয়ে উঠল দেবীর প্রসাদ।

দেবী ও দৈনন্দিন জীবনের মেলবন্ধন
গোপাল পাঁঠার এই উদ্যোগ রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার দোকানের আশপাশেও কালীমূর্তি স্থাপন করে পুজো শুরু করেন অন্যান্য বিক্রেতারা। এভাবেই শহরের বিভিন্ন মাংসের দোকানে নিয়মিত কালীপূজার প্রচলন ঘটে। ধীরে ধীরে এই দেবী পরিচিত হন ‘কসাই কালী’ বা ‘কসাইদের কালী’ নামে। প্রতিদিনই পুজো হয় মায়ের, ধুপধুনো জ্বেলে বিক্রি শুরু করেন দোকানদাররা। ব্যবসা ও ভক্তি দুইয়েরই অদ্ভুত মিশেল দেখা যায় এই প্রথায়।
কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেতাজ বাদশা (Kasai Kali)
জনশ্রুতি অনুযায়ী, গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় শুধু একজন ব্যবসায়ীই ছিলেন না, ছিলেন কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। পুলিশের ‘হিস্ট্রি শিট’-এ তার নাম লেখা ছিল “Leader of the Leaders” অর্থাৎ নেতাদের নেতা। শহরের নানা প্রভাবশালী মহলে তার দাপট ছিল সুপরিচিত। এমনকি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় নাকি স্নেহভরে তাকে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামেই ডাকতেন।

কসাই কালীর মহাপুজো (Kasai Kali)
বছরের প্রতিদিনই কালীপূজা হয় এই দোকানগুলিতে, তবে দীপান্বিতা অমাবস্যায় হয় সবচেয়ে বড় আয়োজন। গোপাল পাঁঠার কলেজ স্ট্রিটের দোকানে প্রতি বছর নতুন কালীমূর্তি গড়া হয় একই কুমোর পরিবারের হাতেই বহু বছর ধরে তৈরি হয় সেই মূর্তি।
দেবীকে সাজানো হয় নতুন গয়না ও শাড়িতে। আয়োজন করা হয় বিশাল অন্নকূটের, যেখানে মাংস ছাড়াও নানা শাকসবজি ও ভোগ নিবেদন করা হয়। বিসর্জনের দিন হয় তরবারি সহযোগে মিছিল, ঢাকের তালে তালে দেবীমূর্তিকে নদীতে ভাসানো হয় রীতিমতো রাজকীয় আয়োজনের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: Kali Puja in Fatakeshto: কে ছিলেন সেই ফাটাকেষ্ট, যার পুজো ছাড়া অসম্পূর্ণ কলকাতার কালীপুজো?
ধর্ম, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার মেলবন্ধন (Kasai Kali)
গোপাল পাঁঠার সূচিত এই প্রথা আজও টিকে আছে কলকাতার বহু মাংসের দোকানে। এটি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতার এক অনন্য প্রতিফলন।একদিকে দেবী আরাধনা, অন্যদিকে জীবিকার প্রশ্ন দুইয়েরই সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী ‘বাঙালি সংস্কার’, যেখানে ভক্তি ও ভোজন হাত ধরাধরি করে চলে।



