Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শক্তির দেবী হিসেবে কালী বা শ্যামা রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন শাক্ত বাঙালিরা (Historical Story of Kali Puja)। হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রে বলা হয়েছে, দেব-দেবীদের মধ্যে তান্ত্রিক উপাসনায় কালী অন্যতম প্রধান দেবী। যাঁরা তন্ত্র-মন্ত্র সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে চান, তাঁরা নিষ্ঠা সহকারে কালীপূজা করে থাকেন। কারণ মা কালীকে ধরা হয় সেই শক্তির উৎস হিসেবে, যিনি ধ্বংসের মাধ্যমে সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করেন।

কালীর উগ্র ও ভয়ঙ্কর রূপ (Historical Story of Kali Puja)
মা কালীর উগ্র রূপের পেছনে রয়েছে গভীর পৌরাণিক তাৎপর্য। শাস্ত্রমতে, তিনি “মহামায়া” দুর্গার এক রূপ। কালী শব্দটি এসেছে “কাল” থেকে, যার অর্থ সময় বা মৃত্যু। সেই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন যিনি, তিনিই কালী। তিনি চতুর্ভূজা এক হাতে খড়গ, অন্য হাতে অসুরের মুণ্ড, আর দুই হাতে বর ও অভয় প্রদান। গলায় নরমুণ্ডের মালা, এলোমেলো চুল, গা ঘন কৃষ্ণবর্ণ, রক্তবর্ণ জিহ্বা বেরিয়ে আছে, এবং তিনি শিবের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এই প্রতীকী ভঙ্গিই বোঝায়, শিব হলেন নিস্তব্ধ চেতনা, আর কালী সেই চেতনার গতিময় শক্তি।

কালীপূজার উৎপত্তি ও বিকাশ (Historical Story of Kali Puja)
প্রাচীন গ্রন্থ ও কিংবদন্তি অনুযায়ী, বাংলায় কালীমূর্তি বা প্রতিমা পূজার প্রচলন প্রথম করেন নবদ্বীপের তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তার আগ পর্যন্ত মা কালীর উপাসনা করা হত তাম্রপটে বা পাথরে খোদাই করা প্রতিমায়। পরে অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালীপূজাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। উনবিংশ শতকে বাংলার জমিদার ও সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলির পৃষ্ঠপোষকতায় কালীপূজা রাজসিক আয়োজন পায়। এর পর থেকে ধীরে ধীরে এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।
কালীপূজার সময় ও প্রথা (Historical Story of Kali Puja)
কালীপূজা সাধারণত দীপান্বিতা অমাবস্যায়, অর্থাৎ লক্ষ্মীপূজার পরবর্তী অমাবস্যার রাতে অনুষ্ঠিত হয়।
তবে আরও কয়েকটি বিশেষ কালীপূজা প্রচলিত রয়েছে,
- মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা
- জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজা
- এছাড়া অনেক সিদ্ধপীঠে প্রতি অমাবস্যা, শনিবার ও মঙ্গলবারে মা কালীর নিয়মিত আরাধনা হয়।

তন্ত্র ও কালীপূজার রহস্য (Historical Story of Kali Puja)
তান্ত্রিক পদ্ধতিতে কালীপূজা মধ্যরাত্রিতে অমাবস্যার রাতে সম্পন্ন হয়। তন্ত্রমতে, রাত্রি মানে “অজ্ঞানের সময়” সেই অন্ধকার দূর করার শক্তি হল কালী। আগেকার দিনে দেবীকে সন্তুষ্ট করতে পশু বলির প্রচলন ছিল, বিশেষত ছাগ বা মহিষ। কিছু জায়গায় এখনো সেই প্রথা বজায় আছে, যদিও আজ অনেক জায়গায় প্রতীকী বলি বা ফল-ভোগের মাধ্যমে পূজা হয়। প্রসাদ হিসেবে লুচি, নানা ফল ও মিষ্টির ভোগ দেওয়া হয়।
নরবলি ও পৌরাণিক কাহিনি (Historical Story of Kali Puja)
ইতিহাসে জানা যায়, প্রাচীনকালে কিছু ডাকাত দল ও অন্ধবিশ্বাসী উপাসকরা নরবলি দিতেন মা কালীর নামে, শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে। যদিও এই প্রথা তন্ত্রের মূল দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তন্ত্র আসলে আত্মসংযম ও জ্ঞানলাভের সাধনা, সহিংসতার নয়।
দেবী কালীর বিভিন্ন রূপ (Historical Story of Kali Puja)
পুরাণে মা কালীর একাধিক রূপের বর্ণনা রয়েছে,
- দক্ষিণা কালী – শুভ ও কল্যাণদায়িনী
- শ্মশান কালী – মৃত্যু ও জীবনের মধ্যবর্তী শক্তি
- ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, চামুণ্ডা, ছিন্নমস্তা, গ্রহ কালী ইত্যাদি
মহাকাল সংহিতায় আরও কিছু বিরল রূপের উল্লেখ আছে কাল কালী, কঙ্কাল কালী, চিকা কালী প্রভৃতি।
বিভিন্ন মন্দিরে তাঁকে আনন্দময়ী, ভবতারিণী, ব্রহ্মময়ী ইত্যাদি নামে পূজা করা হয়।
পৌরাণিক উৎস – শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ (Historical Story of Kali Puja)
‘দেবী মহাত্ম্য’-তে বলা হয়েছে, শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই অসুর দেবলোক দখল করলে, দেবতারা মহামায়ার তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী আবির্ভূত হন। তাঁর দেহকোষ থেকে উৎপন্ন হয় এক কালো রূপ দেবী কৌশিকী, যিনি পরবর্তীতে কালী রূপে পরিচিত হন। সেই কালীই অসুরদের বিনাশ করে দেবলোককে রক্ষা করেন।
আরও পড়ুন: Pandemic Potential From Arctic Ice: জেগেছে নতুন ভাইরাস? প্রাচীন জীবাণু কি আনবে নতুন অতিমারি?
আজকের কালীপূজা আধুনিকতার মেলবন্ধন
বর্তমানে কালীপূজা শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে। আলোকসজ্জা, আতসবাজি, প্যান্ডেল, আরাধনা, আর প্রতিমা দর্শনে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে গোটা বাংলা। তবু এর মূল ভাবনা অপরিবর্তিত অন্ধকার থেকে আলোয়, ভয় থেকে মুক্তির পথে মানুষের আত্মজাগরণই মা কালীর প্রকৃত বার্তা



