Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের সকালেই কলকাতা সাক্ষী থাকল ভারতের প্রতিরক্ষা ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের (Indian Navy)। একদিকে রেড রোডে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যোগাভ্যাসে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অন্যদিকে গার্ডেনরিচে দেশের নৌ-শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ভারতীয় নৌসেনার হাতে তুলে দিলেন তিনটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হল সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই তিন রণতরীকে।

যোগ দিবসেই শক্তির বার্তা (Indian Navy)
আন্তর্জাতিক যোগ দিবস সাধারণত শান্তি, সুস্থতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বার্তা বহন করে। কিন্তু এবারের যোগ দিবসে কলকাতা থেকে দেশ পেল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ‘শান্তির জন্য শক্তি অপরিহার্য’। সেই বার্তাকেই বাস্তব রূপ দিতে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলেন ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য নির্মিত তিনটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ। রেড রোডের অনুষ্ঠান শেষ করেই প্রধানমন্ত্রী পৌঁছে যান গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)-এ। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিক, ভারতীয় নৌবাহিনী ও বায়ুসেনার শীর্ষকর্তারা।
কলকাতার কারখানায় তৈরি ভারতের নতুন গর্ব
গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স বা জিআরএসই দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা জাহাজ নির্মাতা সংস্থা। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য একাধিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করেছে এই প্রতিষ্ঠান। এই তিনটি রণতরীও সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় নির্মিত হয়েছে। ফলে শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নয়, ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার সক্ষমতাও বিশ্বমঞ্চে আরও একবার প্রমাণিত হল।
রাডারকে ফাঁকি দিয়ে নিখুঁত আঘাত (Indian Navy)
তিন যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে আইএনএস দুনাগিরি। এটি একটি অত্যাধুনিক স্টেলথ ফ্রিগেট, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা। স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে এই যুদ্ধজাহাজকে রাডারে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রে এটি বড় সুবিধা দেবে। দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত সেন্সর ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধ পরিচালনা প্রযুক্তি এই জাহাজকে ভারতীয় নৌবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী সম্পদে পরিণত করেছে।

তথ্য সংগ্রহেই যার প্রধান শক্তি (Indian Navy)
আইএনএস সংশোধক একটি বৃহৎ সার্ভে ভেসেল বা জরিপকারী জাহাজ। যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি আক্রমণের বদলে এই জাহাজের মূল কাজ হল সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা, প্রবাহ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা। নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ অভিযান পরিকল্পনা, সাবমেরিন চলাচল, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণে এই ধরনের জাহাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমুদ্রের গভীরে থাকা নানা তথ্য সংগ্রহ করে এটি ভারতীয় নৌবাহিনীকে আরও কার্যকর ও প্রস্তুত থাকতে সাহায্য করবে।
জলের নিচের শত্রুর আতঙ্ক (Indian Navy)
আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল শত্রুপক্ষের সাবমেরিন। কারণ ডুবোজাহাজকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই তৈরি হয়েছে আইএনএস অগ্রয়। এটি একটি বিশেষায়িত অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শিপ, যা সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা শত্রু ডুবোজাহাজ শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম। উন্নত সোনার প্রযুক্তি, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল অস্ত্র ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম এই জাহাজকে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করেছে।
আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা দর্শন (Indian Navy)
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন যে ভারত আর শুধুমাত্র অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হয়ে থাকতে চায় না। বরং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে দেশ। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর নীতিকে সামনে রেখে এখন যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন থেকে শুরু করে আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই দেশে তৈরি হচ্ছে। এর ফলে যেমন বিদেশ নির্ভরতা কমছে, তেমনই কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলছে।
ভারত মহাসাগরে বাড়ছে ভারতের কৌশলগত শক্তি
ভারত তিন দিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত একটি দেশ। দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর। চীনসহ বিভিন্ন দেশের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই তিন যুদ্ধজাহাজ শুধু ভারতের উপকূল নয়, গোটা ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
আরও পড়ুন: Beguner Malaikari: ভিন্ন স্বাদের বেগুন রেসিপি, জামাইষষ্ঠী স্পেশাল বেগুনের মালাইকারি!
কলকাতার গর্ব, দেশের শক্তি
একসময় ব্রিটিশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ছিল কলকাতা। আজ সেই শহরই আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তি গঠনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। গার্ডেনরিচের কারখানায় তৈরি এই তিন রণতরী প্রমাণ করল, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রতিরক্ষা নির্মাতা শক্তিতে পরিণত হতে পারে।



