Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ৮ জুলাই ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনেই ১৯১৪ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এবং দেশের দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী মুখ্যমন্ত্রীদের একজন জ্যোতি বসু। ২০২৬ সালের ৮ জুলাই তাঁর ১১২তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন রাজনীতিবিদকে স্মরণ করা নয়, বরং স্বাধীনোত্তর ভারতের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়কে নতুন করে মূল্যায়ন করা (Jyoti Basu)।

জ্যোতি বসুর জীবন নিয়ে যেমন প্রশংসা রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিতর্ক। তাঁর সমর্থকরা তাঁকে আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম নির্মাতা হিসেবে দেখেন, আবার সমালোচকদের মতে দীর্ঘ শাসনকাল রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বহু সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছিল। তবুও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই—ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব আজও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন (Jyoti Basu)
জ্যোতি বসুর আসল নাম ছিল জ্যোতিরিন্দ্র বসু। ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই কলকাতার এক শিক্ষিত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালি কায়স্থ পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা নিশিকান্ত বসু ছিলেন একজন সুপরিচিত চিকিৎসক এবং মা হেমলতা বসু ছিলেন গৃহবধূ। শিক্ষাজীবনের শুরু হয় কলকাতার লরেটো স্কুলে। এরপর তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল এবং পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থাতেই ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৩৫ সালে তিনি আইন পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স-এর বৌদ্ধিক পরিবেশের সংস্পর্শে আসেন এবং সেই সময় বিখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হ্যারল্ড লাস্কি-র ভাবধারা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ইংল্যান্ডেই কমিউনিজমের সঙ্গে পরিচয় (Jyoti Basu)
বিদেশে গিয়েই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ইংল্যান্ডে ভারতীয় ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি কমিউনিস্ট মতাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন। ধীরে ধীরে তিনি Communist Party of Great Britain-এর কর্মীদের সংস্পর্শে আসেন এবং মার্ক্সবাদী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই সময় ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান, শ্রমিক আন্দোলন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
ভারতে প্রত্যাবর্তন এবং রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
১৯৪০ সালে দেশে ফিরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (CPI)-তে যোগ দেন। প্রথম থেকেই তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। বিশেষ করে রেল শ্রমিকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অসাধারণ বক্তৃতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার জন্য খুব দ্রুতই তিনি দলের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন।
এক অনন্য সংসদীয় ব্যক্তিত্ব (Jyoti Basu)
১৯৪৬ সালে তিনি প্রথমবার বিধানসভায় নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১১ বার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর যুক্তি, তথ্যনির্ভর বক্তব্য এবং সংসদীয় আচরণ তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও সম্মান এনে দেয়।

সিপিআই(এম) প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৬৪ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজনের পর গঠিত হয় সিপিআই(এম)। এই নতুন দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম ছিলেন জ্যোতি বসু। পরবর্তীকালে তিনি দলের পলিটব্যুরোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সূচনা (Jyoti Basu)
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে এবং জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হন। এই সরকার টানা ২৩ বছর ক্ষমতায় ছিল। ১৯৭৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—যা সেই সময়ে ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম মুখ্যমন্ত্রিত্বের রেকর্ড। ভূমি সংস্কার: তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য জ্যোতি বসুর সরকারের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ছিল ভূমি সংস্কার। ‘অপারেশন বর্গা’-র মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভাগচাষিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে, কৃষকদের জমির নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে। আজও ভারতের ভূমি সংস্কারের সফল উদাহরণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের সেই অভিজ্ঞতা আলোচিত হয়।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ (Jyoti Basu)
জ্যোতি বসুর সরকারের আরেকটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। গ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে ভারতের সংবিধানে ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চায়েত ও নগর স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শ্রমিক রাজনীতি ও শিল্পনীতি: সাফল্য ও সমালোচনা, জ্যোতি বসুর সরকার শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৯৬ সালে। লোকসভা নির্বাচনের পরে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের সময় জ্যোতি বসুর নাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উঠে আসে। কিন্তু তাঁর দল সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়। পরে জ্যোতি বসু নিজেই এই সিদ্ধান্তকে বলেন, “Historic Blunder” (ঐতিহাসিক ভুল)। এই মন্তব্য আজও ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বহুল আলোচিত রাজনৈতিক মূল্যায়ন।
আরও পড়ুন: Shapoor Zadran Death: আফগান ক্রিকেটে শোকের ছায়া, প্রয়াত প্রাক্তন পেসার শাপুর জাদরান
আজও কেন প্রাসঙ্গিক জ্যোতি বসু?
আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক, আর্থিক বণ্টন, রাজ্যের অধিকার, স্থানীয় স্বশাসন, কৃষি সংস্কার ও ফেডারেল কাঠামো নিয়ে যে বিতর্ক চলমান, তার অনেক প্রশ্নই জ্যোতি বসু কয়েক দশক আগে উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর সব মতের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু সাংবিধানিক কাঠামো, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং নির্বাচিত রাজ্য সরকারের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবদান আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।



