Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতার কালীপুজোর ইতিহাস যত পুরনো, ততই তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি, রোমাঞ্চ আর ভক্তির গল্প (Kali Puja in Fatakeshto)। উত্তর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটের এক গলির মধ্যে প্রতিবছর যে পুজোটি হয়ে থাকে, সেটিই আজ ‘ফাটাকেষ্টর কালীপুজো’ নামে সমগ্র কলকাতার কাছে এক পরিচিত নাম। ১২১, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট এই ঠিকানাই বহন করে সেই ঐতিহ্য। বর্তমানে ‘নব যুবক সঙ্ঘ’ নামেই পুজোটি আয়োজিত হলেও, বাঙালির মুখে মুখে এটি আজও ‘ফাটাকেষ্টর পুজো’ হিসেবেই খ্যাত।

কে ছিলেন ফাটাকেষ্ট? (Kali Puja in Fatakeshto)
জনশ্রুতি অনুযায়ী, কলকাতার প্রথম দাপুটে লোক বা ‘ডন’ ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত, যিনি ‘ফাটাকেষ্ট’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল তেজস্বী, প্রভাবশালী এবং ভয়জাগানিয়া। একসময় প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্রের পুজোর সঙ্গে তাঁর পুজোর মধ্যে ছিল নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা কখনও ভক্তির জৌলুসকে ম্লান করতে পারেনি। ১৯৯২ সালে ফাটাকেষ্ট প্রয়াত হন। তবুও তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও, আজও তাঁর নামেই সগৌরবে টিকে আছে এই পুজো। মানুষ বলে, ফাটাকেষ্ট ছিলেন যেমন দাপুটে, তেমনি ছিলেন গভীরভাবে ধর্মভীরু। সেই ভক্তি আজও বেঁচে আছে এই পুজোর প্রতিটি ঢাকের তালে।
সিনেমার বনাম বাস্তবের ফাটাকেষ্ট (Kali Puja in Fatakeshto)
২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্বপন সাহা পরিচালিত বাংলা সিনেমা ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’-এর মাধ্যমে এই নাম নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মিঠুন চক্রবর্তীর সেই বিখ্যাত সংলাপ“মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে” আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। তবে বাস্তবের ফাটাকেষ্ট ছিলেন অন্য ধরণের মানুষ কঠোর কিন্তু ভক্তিপরায়ণ, দাপুটে কিন্তু ন্যায়পরায়ণ। তাঁর পুজো ছিল তাঁর গর্ব, তাঁর হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
পুজোর সূচনা ও ঐতিহ্য কোথায়? (Kali Puja in Fatakeshto)
ফাটাকেষ্টর কালীপুজো শুরু হয় লক্ষ্মীপুজোর কিছুদিন পরেই। প্রতি বছর দুর্গাপুজো শেষ হতেই শুরু হয় প্রস্তুতি। কুমোরটুলিতে দেবীর চক্ষুদান পর্ব সম্পন্ন হয় কালীপুজোর প্রায় দশ দিন আগে। এই বছরও, ১৯ অক্টোবর সম্পন্ন হয়েছে সেই চক্ষুদান। দেবীর গাঢ় নীলবর্ণ মূর্তি যেন রাত্রির আকাশ ছুঁয়ে যায়। বিশালাকার এই প্রতিমা যুগের পর যুগ ধরে পূজিত হয়ে আসছে।
ভক্তি ও আড়ম্বরের মিলন
পুজো শুরু হয় প্রতি বছর রাত ৮টা নাগাদ এবং চলে পরের দিন ভোর পর্যন্ত। এই পুজোর আড়ম্বর শুধু চোখ ধাঁধানোই নয়, তার মধ্যে রয়েছে গভীর ভক্তির ছোঁয়া। ফাটাকেষ্টর দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত বলে মানেন ভক্তরা। বিশ্বাস করা হয়, আন্তরিকভাবে পুজো করলে মা মনস্কামনা পূরণ করেন। পুজোর সময় মানত পূরণ করতে বহু মানুষ আসেন কলকাতা ও বাইরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। রাস্তা জুড়ে সাজসজ্জা, আলো, ঢাক, শঙ্খধ্বনি আর মন্ত্রোচ্চারণে ভরে ওঠে উত্তর কলকাতার আকাশ।
প্রতিমা আগমনের রীতি (Kali Puja in Fatakeshto)
এই পুজোর অন্যতম বিশেষ দিক হল প্রতিমা আগমনের শোভাযাত্রা। বলা হয়, কুমোরটুলি থেকে ফাটাকেষ্টর কালীমূর্তি না বেরোলে অন্য কোনও মণ্ডপের প্রতিমা বার করা হয় না। বহু ভক্ত, ঢাকি, আলো ও গানের তালে তালে শোভাযাত্রার মাধ্যমে মা কালীকে নিয়ে আসা হয় পুজো স্থলে। এটি এক অনবদ্য দৃশ্য, যা দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন।
তারকা সমাবেশের দিনগুলি (Kali Puja in Fatakeshto)
একসময় এই পুজো ছিল যেন এক উৎসবের মেলা। অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খন্না, আশা ভোঁসলে, আর. ডি. বর্মনের মতো বলিউড ও সঙ্গীত জগতের তারকারা উপস্থিত থাকতেন এই পুজোয়। তাঁদের আগমনে তখনকার উত্তর কলকাতার গলি যেন হয়ে উঠত আলোয় ভরা মহোৎসব। যদিও আজ সেই তারকাখচিত চাঁদের হাট আর নেই, তবুও মানুষের উন্মাদনা একটুও কমেনি।
আরও পড়ুন: kali Puja Chapter 3: শিয়ালকে কেন খাওয়ানো হয় ফুল্লরা দেবীর পূজায়?
আজও অমলিন ঐতিহ্য
ফাটাকেষ্ট প্রয়াত হয়েছেন বহু বছর আগে, কিন্তু তাঁর নাম আজও অমর। তাঁর পুজো আজও কলকাতার গর্ব, উত্তর কলকাতার প্রাণ। প্রতিবছর কালীপুজোর রাতে এই পুজোকে ঘিরে জনমানসে যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা প্রমাণ করে ফাটাকেষ্ট শুধু এক নাম নয়, এক বিশ্বাস, এক ঐতিহ্য, এক কিংবদন্তি।



