Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: লোকসভা থেকে সাসপেন্ড হওয়ার পরই তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন (Kalyan Banerjee), সংসদের অধিবেশন যতদিন চলবে, ততদিন তিনি নিয়ম করে সংসদ চত্বরে এসে তাঁর সাসপেনশনের প্রতিবাদ জানাবেন। সেই প্রতিশ্রুতি মতো বৃহস্পতিবারও সংসদ চত্বরে দেখা গেল তাঁকে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় এদিনের প্রতিবাদে ছিল আলাদা মাত্রা। একদিকে যেমন তাঁর নিশানায় ছিল তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদরা, অন্যদিকে বিক্ষোভ চলাকালীন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাসপেনশনের প্রতিবাদে ফের একাকী কল্যাণ (Kalyan Banerjee)
সংসদে কুকথা বলা, সাংসদদের অপমান করা এবং নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করার অভিযোগে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করেছেন। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই গত কয়েকদিন ধরে সংসদ চত্বরে একাকী বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তিনি। কল্যাণের বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাই সংসদের অধিবেশন চলাকালীন প্রতিদিনই তিনি নিজের মতো করে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৃহস্পতিবারও সেই ধারাবাহিকতায় সংসদের মকর দ্বারের সামনে অবস্থান করেন তিনি। কখনও সংসদের প্রবেশপথের সামনে, কখনও সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে দেখা যায় তাঁকে।
হাতে অভিনব ব্যানার, ছবিতে ২০ সাংসদ (Kalyan Banerjee)
এদিন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তাঁর হাতে থাকা ব্যানার। ব্যানারে একসঙ্গে ২০ জন সাংসদের ছবি ব্যবহার করা হয়। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত এনসিপিআই সাংসদদের তালিকা ধরে তাঁদের ছবি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই ব্যানার। সেই ব্যানার সামনে রেখেই কল্যাণের স্লোগান ছিল ‘মোদি কে সাথ ২০ গদ্দার।’ অর্থাৎ, ওই সাংসদরা কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এমনই রাজনৈতিক অভিযোগকে সামনে রেখে তাঁদের নিশানা করেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। তাঁর এই একাকী প্রতিবাদ স্বাভাবিকভাবেই সংসদ চত্বরে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে। ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে একের পর এক স্লোগান দিতে থাকেন তিনি।
হঠাৎ সামনে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী (Kalyan Banerjee)
কল্যাণের এই বিক্ষোভ চলাকালীনই সংসদ ভবন থেকে কয়েকজন কংগ্রেস সাংসদ বেরিয়ে আসছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। প্রিয়াঙ্কাকে দেখতে পেয়েই তাঁর উদ্দেশে কথা বলতে শুরু করেন কল্যাণ। তিনি বলেন, “প্রিয়াঙ্কা জি, সদন মে মোদি কে সাথ ২০ গদ্দার হ্যায়।” কল্যাণের কথা শুনে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও হাসতে হাসতে তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন। এরপর দু’জনের মধ্যে শুরু হয় রাজনৈতিক কথোপকথন। আর সেই কথোপকথনেই উঠে আসে তৃণমূল, কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ।
‘এরা একসময় কংগ্রেসে ছিলেন’ (Kalyan Banerjee)
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কল্যাণকে উদ্দেশ করে বলেন, এই সাংসদরা একসময় কংগ্রেসে ছিলেন। পরে তাঁরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। এখন তাঁরাই তৃণমূলকে ‘ধোঁকা’ দিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কার এই মন্তব্যের পরেই কথোপকথনের সুর কিছুটা বদলে যায়। কল্যাণ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, শুধু ওই সাংসদদের কংগ্রেসে থাকার প্রসঙ্গ কেন তোলা হচ্ছে? তিনি বলেন, তৃণমূলের বহু নেতাই একসময় কংগ্রেসে ছিলেন। এমনকি তাঁরাও কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপরই আলোচনায় চলে আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেস ছাড়ার ইতিহাস।
মমতার কংগ্রেস ছাড়ার প্রসঙ্গ টেনে পাল্টা আক্রমণ
কংগ্রেস প্রসঙ্গ উঠতেই কল্যাণ বলেন, কংগ্রেসে থাকার ইতিহাস শুধু ওই সাংসদদের নয়। তাঁরাও একসময় কংগ্রেসে ছিলেন। এরপর তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি বামেদের ‘বি টিম’-এর মতো কাজ না করত, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হত না। এর ফলে কথোপকথন কার্যত তৃণমূল বনাম কংগ্রেসের পুরনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের দিকে চলে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেস ছাড়ার প্রেক্ষাপট এবং রাজ্যে বামফ্রন্টের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের সময় কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন কল্যাণ।

‘রাজীবজির সঙ্গে দিদির সম্পর্ক ভালো ছিল’ (Kalyan Banerjee)
কল্যাণের বক্তব্যের জবাবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী অবশ্য উত্তেজিত না হয়ে হাসিমুখেই পাল্টা জবাব দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁর বাবা এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ভালো ছিল। প্রিয়াঙ্কার এই মন্তব্যও কথোপকথনে নতুন মাত্রা যোগ করে। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকের সঙ্গে গান্ধী পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে প্রিয়াঙ্কার বক্তব্যে কল্যাণ সন্তুষ্ট হননি। তিনি পাল্টা বলেন, সেই সম্পর্ক আপনারাই ধরে রাখতে পারেননি।
পাপ্পু যাদবকেও থামালেন কল্যাণ (Kalyan Banerjee)
দু’জনের কথোপকথনের মাঝেই কংগ্রেসপন্থী নির্দল সাংসদ পাপ্পু যাদবও কিছু বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু কল্যাণ তাঁকেও থামিয়ে দেন। যদিও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও কথোপকথন শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের বাকবিতণ্ডায় গড়ায়নি। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও নিজের স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখ বজায় রেখেই পরিস্থিতি সামাল দেন। ফলে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের মধ্যেও ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্য সংঘাতের রূপ নেয়নি।
পুরনো সম্পর্ক, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ (Kalyan Banerjee)
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ শুধু তাঁর সাসপেনশনের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একদিকে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ, অন্যদিকে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের পুরনো সম্পর্ক নিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে কথোপকথন—সব মিলিয়ে এদিনের ঘটনা জাতীয় রাজনীতির নানা স্তরকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ‘২০ গদ্দার’ স্লোগান এবং ২০ জন সাংসদের ছবি-সহ ব্যানার ছিল দিনের অন্যতম রাজনৈতিক বার্তা। একইসঙ্গে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এসেছে কংগ্রেস থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসও।
আরও পড়ুন: Kanyashree: বদলে গেল কন্যাশ্রীর নাম! তালিকায় সবুজ সাথীও!
বিক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক বার্তা
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ধারাবাহিক একাকী বিক্ষোভ এখন কার্যত তাঁর রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি আলাদা রূপ নিয়েছে। সাসপেনশনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি শুধু নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন না, একইসঙ্গে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের সম্পর্ক নিয়েও বার্তা দিচ্ছেন।



