Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কোনও অধ্যায় নেই, যেখানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নাম একে অপরের ছায়া ছাড়া উচ্চারিত হয়েছে (Khaleda Zia-Sheikh Hasina)। প্রায় চার দশক ধরে এই দুই নেত্রী শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিলেন না, বরং একে অপরের বিপরীতে দাঁড়ানো দুই ভিন্ন বাংলাদেশি দর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। এই লড়াই কখনও সংসদে, কখনও রাজপথে, আবার কখনও ব্যক্তিগত বিদ্বেষের স্তরে নেমে গিয়েছে যার প্রভাব পড়েছে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর।

উত্তরাধিকার বনাম সামরিক জাতীয়তাবাদ (Khaleda Zia-Sheikh Hasina)
শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনীতি মূলত জন্ম নিয়েছে দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে। শেখ হাসিনা হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এই আদর্শ ছিল তাঁর রাজনৈতিক DNA-র অংশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, একটি রাষ্ট্রের আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় এক অনিচ্ছাকৃত বাস্তবতায়। তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর জেনারেল, যিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরবর্তী অস্থির সময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং পরে রাষ্ট্রপতি হন। জিয়াউর রহমান যে জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন, তা ছিল ইসলামিক মূল্যবোধ ও সামরিক শৃঙ্খলায় অনুপ্রাণিত যা মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করত। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া কার্যত বাধ্য হন বিএনপির নেতৃত্ব নিতে।

এক সময়ের ঐক্য (Khaleda Zia-Sheikh Hasina)
আজকের রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক বিস্মৃত অধ্যায় যেখানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ছিলেন একই আন্দোলনের শরিক। ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেন মহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল জারি করেন। গণগ্রেফতার, জরুরি অবস্থা ও নাগরিক স্বাধীনতা হরণে দেশ কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। এই সময়েই রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই নেত্রীকে এক মঞ্চে এনে দাঁড় করায়। আওয়ামী লিগ ও বিএনপি বুঝে যায় এরশাদকে সরাতে হলে ঐক্য ছাড়া উপায় নেই। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান, লাগাতার হরতাল ও রাজপথের আন্দোলনের ফলে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মুহূর্ত এক বিরল গণতান্ত্রিক জয়ের উদাহরণ।
ঐক্য থেকে শত্রুতা (Khaleda Zia-Sheikh Hasina)
এরশাদের পতনের পরই দুই নেত্রীর সম্পর্ক দ্রুত বদলে যায়। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু হয় প্রকৃত অর্থে “দুই বেগমের লড়াই”। নির্বাচন আর কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, হয়ে ওঠে অস্তিত্বের যুদ্ধ। ক্ষমতায় থাকা মানেই প্রতিপক্ষকে দমন করা এই মানসিকতা গ্রাস করে রাজনীতিকে। দুর্নীতির মামলা, গ্রেফতার, সংসদ বয়কট, হরতাল, রাজপথে হিংসা সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
তত্ত্ববধায়ক সরকার বিতর্ক (Khaleda Zia-Sheikh Hasina)
এই শত্রুতার সবচেয়ে গভীর প্রতিফলন দেখা যায় তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ঘিরে। খালেদা জিয়ার মতে, রাজনৈতিক সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন অসম্ভব। তাই তত্ত্ববধায়ক সরকারই একমাত্র নিরপেক্ষ পথ। বিপরীতে শেখ হাসিনা এই ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক বলে দাবি করেন। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি হলে কেয়ারটেকার সরকার দুর্নীতির অভিযোগে দুই নেত্রীকেই গ্রেফতার করে যা ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপেই এক বছর পর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১১ সালে হাসিনা সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্ববধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন বয়কট, সহিংসতা ও রিগিংয়ের অভিযোগে জর্জরিত হয়।
ক্ষমতার দীর্ঘ শাসন ও বিরোধী শূন্যতা (Khaleda Zia-Sheikh Hasina)
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে বিএনপি অভিযোগ করে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিচারব্যবস্থার উপর প্রভাব, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া এবং বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার ১৭ বছরের সাজা বিএনপিকে কার্যত নেতৃত্বশূন্য করে তোলে।
আরও পড়ুন: Delhi Fog: ঘন কুয়াশায় ঢেকে দিল্লি, বাতিল শতাধিক বিমান, জারি লাল সতর্কতা!
দুই বেগমের অনুপস্থিতি
২০২৪ সালে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় গণ-অভ্যুত্থানে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি আবার রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।



