Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতা এমন এক শহর, যেখানে শীত এলেই সংস্কৃতি যেন নতুন করে শ্বাস নেয় (Kolkata Comics Carnival)। বইমেলা, নাট্যোৎসব, চলচ্চিত্র উৎসবের ভিড়ে গত কয়েক বছরে নিঃশব্দে কিন্তু দৃঢ়ভাবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে কলকাতা কমিক্স কার্নিভ্যাল। দেখতে দেখতে ছয় বছরে পা দেওয়া এই কার্নিভ্যাল আজ আর শুধুই কমিক্সপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্র নয় এটি হয়ে উঠেছে এক প্রজন্মান্তরের সাংস্কৃতিক সেতু। এ বছর স্থান বদলে ‘ধন ধান্য’ থেকে সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়াম কিন্তু বদলায়নি তার আত্মা। বরং বৃহত্তর পরিসরে এই কার্নিভ্যাল আরও বেশি প্রাণবন্ত, আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠেছে।

কেবল বিনোদন নয়, এক বিকল্প সংস্কৃতি (Kolkata Comics Carnival)
কমিক্সকে বহুদিন ধরেই হালকা বিনোদনের তকমা দেওয়া হয়েছে। অথচ কলকাতা কমিক্স কার্নিভ্যাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কমিক্স আসলে এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ মাধ্যম। এখানে যেমন পাওয়া যায় সুপারহিরোদের অ্যাকশন-প্যাকড দুনিয়া, তেমনই পাওয়া যায় সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে তৈরি আধুনিক গ্রাফিক নভেল। ফলে কমিক্স হয়ে ওঠে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার এক বিকল্প পথ, বিশেষ করে নবীন প্রজন্মের কাছে।
নস্ট্যালজিয়ার টান ও শিকড়ের সন্ধান (Kolkata Comics Carnival)
কার্নিভ্যালের এক বড় অংশ জুড়ে থাকে নস্ট্যালজিয়া। ইন্দ্রজাল কমিক্সের স্টল, পুরনো প্রচ্ছদ, বাঁটুল দি গ্রেট বা নন্টে-ফন্টের ঝলক সব মিলিয়ে এক সময়ভ্রমণের অনুভূতি। যাঁরা ছোটবেলায় এই কমিক্স পড়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এটি স্মৃতির পুনরাবিষ্কার। আবার যাঁরা প্রথমবার এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, তাঁদের কাছে এটি শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরির এক সুযোগ।

শতবর্ষে এক সাংস্কৃতিক ঋণস্বীকার (Kolkata Comics Carnival)
এ বছরের কার্নিভ্যাল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি উৎসর্গ করা হয়েছে নারায়ণ দেবনাথের শতবর্ষকে। বাংলার কমিক্স জগতের এই কিংবদন্তি শিল্পী কেবল চরিত্র সৃষ্টি করেননি, তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ভাষা। কার্নিভ্যালের প্রবেশপথে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয় আজকের এই রঙিন উৎসবের শিকড় কোথায়। প্রেজেন্টেশন, আলোচনা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁর কাজ ও জীবনের নানা দিক নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
কল্পনার সামাজিক উদ্যাপন (Kolkata Comics Carnival)
কলকাতা কমিক্স কার্নিভ্যালের অন্যতম আকর্ষণ কসপ্লে। এটি নিছক সাজগোজ নয়, বরং কল্পনার সামাজিক উদ্যাপন। ছোটবেলার মুখোশ খেলার অভ্যাস এখানে পায় পরিণত, শৈল্পিক রূপ। তরুণ-তরুণীরা তাঁদের প্রিয় চরিত্রের পোশাকে মঞ্চে উঠছেন, পারফর্ম করছেন ফলে দর্শক ও অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ভেদরেখা মুছে যায়। কসপ্লে এখানে হয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের এক মুক্ত মঞ্চ।

পণ্যের বাজারে শিল্পের বিস্তার (Kolkata Comics Carnival)
কার্নিভ্যালের স্টলগুলোয় চোখে পড়ে এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক অর্থনীতি। পোস্টার, স্টিকার, আর্ট প্রিন্ট, মুখোশ, পুতুল, টি-শার্ট, মগ , কমিক্সকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক সম্পূর্ণ সৃজনশীল বাজার। এখানে শুধু বড় ব্র্যান্ড নয়, স্বাধীন শিল্পী ও ছোট উদ্যোগেরও জায়গা আছে। ফলে এই কার্নিভ্যাল শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে সরাসরি সংযোগ ঘটায়।
বৈশ্বিক মঞ্চে বাঙালিয়ানার উপস্থিতি (Kolkata Comics Carnival)
এই বহুজাতিক কমিক্স জগতের মাঝেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে ‘বিশ্ব বাংলা হাব’। তাদের অংশগ্রহণ কার্নিভ্যালকে একটি আলাদা মাত্রা দেয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের কাছে বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। কমিক্স কার্নিভ্যালের মতো আধুনিক ও তরুণমুখী প্ল্যাটফর্মে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে বাংলা সংস্কৃতি কেবল অতীতনির্ভর নয়, বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে নতুন করে প্রকাশ করতে সক্ষম।

আরও পড়ুন: US Flight: একদিনেই বাতিল হাজারের বেশি উড়ান: ভ্রমণ মরসুমে আমেরিকায় চরম যাত্রী দুর্ভোগ
শহুরে সংস্কৃতির গণতন্ত্র
মাত্র ৩০ টাকার টিকিটে তিনদিনের প্রবেশাধিকার এই সিদ্ধান্ত কার্নিভ্যালকে বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। এটি কেবল উচ্চবিত্ত বা নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য সীমাবদ্ধ নয়। এই সহজলভ্যতাই কলকাতা কমিক্স কার্নিভ্যালকে শহরের আট থেকে আশির এক মিলনমেলায় পরিণত করেছে।



