Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ফুটবল না খেলেও তিনি হয়ে উঠেছেন মাঠের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট। যাঁর সিদ্ধান্তের সামনে হার মেনেছেন তারকা থেকে মহাতারকারা (Pierluigi Collina)।
বাঁশি গলায় ফুটবল সৈনিক (Pierluigi Collina)
সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি হলেই যে সিনেমা নির্মাণ সহজ হয়ে যায় তা নয়। এরপর বেশিরভাগ দায়িত্ব এসে পড়ে পরিচালকের কাঁধে। যত দক্ষ অভিনেতা হোক না কেন তিনিও সেই সময় পরিচালকের তত্ত্বাবধানে নিজেকে ছেড়ে দেন। আবার কোনও অভিনেতা যদি ভাবেন এই দৃশ্যে কিছুটা ফাঁকি দেওয়া যাবে অমনি পরিচালক বলে ওঠেন ‘কাট’। অর্থাৎ আবার নতুন করে সেই দৃশ্য অভিনয় করতে হবে (Pierluigi Collina)।
এত গেল সিনেমার কথা এবার ব্যাক টু পাড়া কালচার। পাড়ায় পাড়ায় অনেক সময় দেখা যায় নানা রকম টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে। ক্রিকেট হোক বা ফুটবল, আবার টেনিস হোক বা ব্যাডমিন্টন, সেখানে স্পষ্ট করে লেখা থাকে আম্পায়ারের বা রেফারির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তবে অনেক সময় সেই নিয়ে মত বিরোধ থাকলেও কারোর কিছু বলার থাকে না। ধর্মতলা থেকে যদি কিছুটা এগিয়ে যাওয়া যায় তবে দেখা যাবে সেখানে বিক্রি হচ্ছে ফুটবল তারকাদের নাম লেখা জার্সি। সেখানে এমবাপে আছেন, মেসি, রোনাল্ডো, নেইমার সকলেই আছেন তবে বিশ্ব ফুটবলে ফুটবল না খেলেও যিনি রাজত্ব করেছেন সেই কিংবদন্তিতে সেখানে পাবেন না। কারণ তিনি বল পায়ে নামেননি বরং বারবার থেকেছেন পরিচালকের আসনে।
যতদিন এগিয়েছে মানুষ হয়েছে প্রযুক্তি নির্ভর। নানান প্রযুক্তি আরও উন্নত করেছে প্রতিটা ক্ষেত্র। বাদ যায়নি ফুটবল ময়দান। সেখানেও যেমন এসেছে গোল লাইন প্রযুক্তি তেমনই এসেছে ভার-এর ব্যবহার। এগুলো সবই আনা হয়েছে রেফারিকে সাহায্য করার জন্য তবে যদি বলি ফুটবল ময়দানে এমন এক রেফারি ছিলেন যাঁর কাছে হার মানত প্রযুক্তিও? আবার বলা যায় তাঁর মত নির্ভুল অনেক সময় প্রযুক্তিকেও হার মানায়। এই আলোচনার মূল নায়ক কোনও ফুটবলার নন বরং আজ পর্যন্ত জন্মানো শ্রেষ্ঠ রেফারি। তাঁর নাম পিয়েরলুইজি কলিনা। যাঁর শীতল এবং কঠিন দৃষ্টিকে ভয় পেতেন তাবড় তাবড় তারকারাও (Pierluigi Collina)।
ফুটবল ক্যানভাসে তাঁর পায়ের জাদুতে কোনও গোল আসেনি তবুও তিনিই নির্ধারণ করেছেন একাধিক প্লেয়ার এবং দলের ভাগ্য। এই জাদুকরের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছে সব দল। তাঁর বাঁশির শব্দ, কার্ড আর জ্বলন্ত চোখ ফুটবলারদের কাছে নাইট-মেয়ারের থেকে কম কিছু না। সেই কলিনাই ফুটবল ইতিহাসের সবথেকে প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় রেফারি বা আইকন।
এক সময় সেনা বাহিনীতে থাকা কলিনার ম্যাচ পরিচালনার এই সহজাত ক্ষমতা প্রকাশ পায় ১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসার পর। তিনিই সেই কম সংখ্যক রেফারির মধ্যে পড়েন যিনি পুরো ৯০ মিনিট দৌড়ে বেড়াতে সক্ষম। ফুটবলাররা ক্লান্ত হলেও তিনি ক্লান্ত হন না। সেটার কারণ সম্ভবত আর্মি-তে থাকাকালীন দৈহিক পরিশ্রমের ক্ষমতা বাড়ানো (Pierluigi Collina)। সেই কারণেই ফুটবলার বল নিয়ে যেদিক দিয়ে এগিয়ে যান তিনিও সেই দিকে দৃষ্টি রেখে দৌড়ানোর সহজাত ক্ষমতার অধিকারী।
তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দায়িত্ব পান ইতালিয়ান ফুটবল লিগের তৃতীয় বিভাগের ম্যাচ পরিচালনার। এখান থেকেই ফুটবল বিশ্ব পেল তাঁর শ্রেষ্ঠ রেফারিকে। মাঠে সব তারকা ফুটবলারের অহংকার চলে যায় তাঁর দৃষ্টির সামনে। ফুটবল পরিচালনার সময় একচ্ছত্র সম্রাট তিনি। চুলহীন সেই মসৃণ মাথা আর কঠিন দৃষ্টি, প্লেয়ারদের মনে তৈরি করত এক মানসিক ভীতি আর সেখান থেকেই তাঁরা বিরত থাকতেন কোনও রখম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর থেকে।
তবে কলিনার কঠোর মনের অন্দরে লুকিয়ে আছে সংবেদনশীল এবং মানবিক দিক। যা প্রকাশ্যে কমই এসেছে। তবে একটি ঘটনার অবতরণ করলে সেটার কিছুটা হদিশ পাওয়া যায়। একবার এক ইতালিয়ান লিগে এক কৃষাঙ্গ প্লেয়ারকে বর্ণবাদী আক্রমণ করায় তিনি খেলায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেখানে কোনও ক্যামেরা বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন পড়েনি তাঁর চোখই ছিল যথেষ্ট। ক্যামেরার থেকেও সেই তীক্ষ্ণ চোখে বাদ পড়ত না কিছুই (Pierluigi Collina)।
বিশ্বকাপের প্রাক্কালে সেই বিশ্ব সেরা রেফারির কথা না বললেই নয়। ইতালির ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবলে মাত্র ৪৩টি ম্যাচে রেফারিং করার পরেই কলিনা ফিফা রেফারির পরিচিতি পান। তবে তিনি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় ১৯৯৬ সালের অলিম্পিক্সে। সেখানেও তিনি পরিচালনা করেন ফাইনাল ম্যাচ আর সেখানে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে পদক জিতে নেয় নাইজেরিয়া।
আরও পড়ুন: AI Flight: এয়ার ইন্ডিয়া বিমান দুর্ঘটনা: বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি পাইলটদের, রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বকাপে কলিনা
১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপ ছিল কলিনার কেরিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ। গ্রুপ লিগের দুটি ম্যাচ পরিচালনার দায়ভার এসেছিল এই ৩৮ বছর বয়সী ইতালিয়ানের উপরে (Pierluigi Collina)।
এরপর আবার চার বছরের অপেক্ষা। ২০০২ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল কলিনার ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। জার্মানি ও ব্রাজিলের মধ্যকার সেই চাপ দিয়ে ঘেরা ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক ম্যাচটি তিনি পরিচালনা করেছিলেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে, সেখানে ভুলের কোনও পরিসর ছিল না। পাঁচবার বিশ্বের সেরা রেফারি নির্বাচিত হওয়া কলিনা ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য ও শৈল্পিক উচ্চতায়, তাঁকে রেফারিং জগতের পিকাসো বললেও ভুল হবে না।
১৯৮৪ সালে হুট করে ‘অ্যালোপেসিয়া’ রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১৫ দিনে সব চুল হারিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই শারীরিক পরিবর্তনের কাছে কোনও প্রকার হার না মেনে এটাকেই তিনি নিজের শক্তিতে রূপান্তর করেন। মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন খাঁটি ইতালিয়ান স্টাইলের এক সুপুরুষ, যিনি বিশ্বজুড়ে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে জাপানের বিজ্ঞাপনেও মডেল হিসেবে কাজ করেছেন এই জাদুকর।
কলিনার সেই ভয়ংকর অথচ মায়াবী চোখের চাউনি আর মাঠের কঠোর শাসনের কথা স্মৃতিতে দর্শক তখন রোমাঞ্চিত হয়েছেন বারবার। আজ যান্ত্রিক ফুটবলের যুগে অনেক রেফারি আসেন, কিন্তু কলিনার মতো কেউ আর আসেন না, যিনি মাঠে ফুটবলারদের চেয়েও বড় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন। পিয়েরলুইজি কলিনার শূন্যতা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেই বসন্তের বিকেল যেখানে এক মায়াবি দৃশ্য পরিচালনা করছেন শ্রেষ্ঠ কোনও এক পরিচালক (Pierluigi Collina)।


