Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক (Rath Yatra)। রাজ্যের নানা প্রান্তে জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হলেও উত্তর কলকাতার বরানগরের চক্রবর্তী পরিবারের রথযাত্রার রয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়। প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরনো এই রথযাত্রা ঘিরে আজও প্রচলিত রয়েছে নানা অলৌকিক বিশ্বাস। পাশাপাশি ভক্তি ও মানবসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্তও গড়ে তুলেছে এই পরিবার ও তাদের সহযোগী সংগঠন নবজীবন যুবক সংঘ।
অলৌকিক ঘটনার হাত ধরেই রথযাত্রার সূচনা (Rath Yatra)
চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, বহু বছর আগে এক অলৌকিক ঘটনার পরই এই রথযাত্রার সূচনা হয়। সেই ঘটনার স্মৃতি আজও পরিবারের প্রবীণদের মুখে মুখে ফিরে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে পালন করা হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব। পরিবারের কাছে এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এক অমূল্য সম্পদ।
স্নানযাত্রার পর দেববিগ্রহের শরীরে ঘাম!(Rath Yatra)
বরানগরের এই জগন্নাথ বাড়ির সবচেয়ে আলোচিত এবং বিস্ময়কর বিশ্বাস হল, স্নানযাত্রার পর পুজোর সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার দেববিগ্রহের শরীর থেকে ঘাম বেরিয়ে আসে। পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতি বছরই এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়। ভক্তদের কাছে এটি কোনও সাধারণ বিষয় নয়, বরং মহাপ্রভুর জীবন্ত উপস্থিতির এক অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান বরানগরের এই ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বাড়িতে।

‘মাসির বাড়ি’র উদ্দেশে মহাপ্রভুর যাত্রা (Rath Yatra)
রথযাত্রার দিন চক্রবর্তী পরিবারের জগন্নাথ বাড়ি থেকে বিশাল কাঠের রথে চেপে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রওনা দেন নবজীবন যুবক সংঘ ক্লাবের উদ্দেশে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই ক্লাবই মহাপ্রভুর ‘মাসির বাড়ি’। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থানের পর উল্টো রথের দিন আবার নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন মহাপ্রভু। এই নগর পরিক্রমাকে কেন্দ্র করে গোটা বরানগর কার্যত উৎসবের আবহে মেতে ওঠে। রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ মহাপ্রভুর দর্শনের অপেক্ষায় থাকেন। শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টা, উলুধ্বনি এবং হরিনামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে রথ।
২৬ ফুট উঁচু, ৯ হাজার কেজির বিশাল রথ (Rath Yatra)
এই রথযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ হল প্রায় ২৬ ফুট উচ্চতার এবং প্রায় ৯ হাজার কেজি ওজনের বিশাল কাঠের রথ। সুদৃশ্য কারুকাজে সাজানো এই রথ প্রতিবছর অসংখ্য দর্শনার্থীর নজর কেড়ে নেয়। ভক্তদের হাতে রশি ধরে টানা এই রথ যেন বিশ্বাস ও ভক্তির এক চলমান প্রতীক। শুধু বরানগর নয়, কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকেও বহু মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা প্রত্যক্ষ করতে আসেন।
এক সপ্তাহজুড়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
রথযাত্রা থেকে উল্টো রথ পর্যন্ত টানা সাতদিন ধরে চলে নানা অনুষ্ঠান। প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হয় ভক্তিমূলক সঙ্গীত, কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সন্ধ্যা নামতেই উৎসবের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের মতে, এই অনুষ্ঠানগুলির মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বিনোদন নয়, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরা।
‘অপরাজিতা ভোগ’—ভক্তদের বছরের প্রতীক্ষা (Rath Yatra)
রথযাত্রা উপলক্ষে প্রতিদিনই মহাপ্রভুকে নিবেদন করা হয় নানান ধরনের অন্ন, তরকারি, ফল ও মিষ্টির ভোগ। তবে সব কিছুর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ‘অপরাজিতা ভোগ’। এই বিশেষ ভোগের স্বাদ গ্রহণের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন অসংখ্য ভক্ত। অনেকেই শুধুমাত্র এই ভোগ গ্রহণের উদ্দেশ্যেই প্রতি বছর বরানগরের চক্রবর্তী পরিবারের রথযাত্রায় উপস্থিত হন। ভক্তদের বিশ্বাস, মহাপ্রভুর এই প্রসাদ গ্রহণ করলে জীবনে শুভ শক্তির আশীর্বাদ লাভ হয়।
ধর্মের সঙ্গে মানবসেবার অঙ্গীকার (Rath Yatra)
চক্রবর্তী পরিবারের এই আয়োজন শুধুমাত্র পূজা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। উৎসবের সঙ্গে সমান গুরুত্ব পায় সমাজসেবাও। উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রায় ৭০০ জন মহিলার হাতে তুলে দেওয়া হবে নতুন শাড়ি এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। পাশাপাশি প্রায় ৫ হাজার মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে মহাপ্রভুর প্রসাদ। আয়োজকদের মতে, প্রকৃত ধর্ম তখনই সার্থক হয়, যখন তার সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই রথযাত্রার আনন্দকে মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মানবিকতার অনন্য মেলবন্ধন
বরানগরের চক্রবর্তী পরিবারের রথযাত্রা শুধুমাত্র একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়, এটি উত্তর কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। অলৌকিক বিশ্বাস, বিশাল রথ, ঐতিহ্যবাহী ভোগ, ভক্তিমূলক অনুষ্ঠান এবং সমাজসেবার সমন্বয়ে এই রথযাত্রা আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আরও পড়ুন: Debraj Chakraborty: তোলাবাজি থেকে ভিন রাজ্যে বিনিয়োগ! দেবরাজ কাণ্ডে আর কী কী তথ্য উঠে আসছে?
প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের সমাগম প্রমাণ করে, ধর্মের প্রকৃত শক্তি কেবল আচার-অনুষ্ঠানে নয়, বরং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সম্প্রীতি এবং সহমর্মিতা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত। সেই কারণেই বরানগরের চক্রবর্তী পরিবারের রথযাত্রা আজও ভক্তদের কাছে এক গভীর আবেগ, এক অটুট বিশ্বাস এবং এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে রয়েছে।



