Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ২৪ এপ্রিল সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এক আবেগের দিন, আজ ক্রিকেটের ঈশ্বর তথা শচীন তেন্ডুলকরের জন্মদিন (Sachin Tendulkar)।
শিবাজি পার্কের শচীন থেকে ক্রিকেটের মাস্টার-ব্লাস্টার (Sachin Tendulkar)
ছিল না প্রথাগত সংগীত শিক্ষা বা তালিম। কিন্তু তিনিই হয়ে উঠলেন বলিউডের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। শুরুটা বোম্বে টকিজে কোরাস গায়ক হিসেবে। যেখান থেকে শুরু এক কিংবদন্তির যাত্রাপথ। দাদার হাত ধরে ১৯৪৬ সালে প্রথম অভিনয়। এরপর ১৯৪৮ সালে প্লে-ব্যাক। কিন্তু শুরুটা যে কাঁটার পথে হাঁটতে হয়েছিল তাঁকে আর সেই রক্তক্ষরণের কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন আভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায় থেকে কিশোর কুমার (Sachin Tendulkar)।
গানের প্রতি তাঁর শর্তহীন ভালবাসাই তাঁকে আলাদা করে তোলে বা বলা ভাল শ্রেষ্ঠ করে তোলে। তাঁর প্রিয় শিল্পী ছিলেন কে এল সায়গল ও আহমেদ রুশদি। এস. ডি. বর্মনের এক উপদেশে বদলে যায় তাঁর জীবন। তিনি সেই সময় উপদেশ দেন কিশোরকে ‘নিজের কণ্ঠে গান করো।’ সেই থেকেই জন্ম নেয় কিশোরের স্বকীয় স্টাইল বা যা পরিচিত ইয়োডলিং নামে। পাশ্চাত্য প্রভাব মেসে ভারতীয় সুরে। ‘রূপ তেরা মস্তানা’, ‘জিন্দেগি এক সাফর’, ‘পল পল দিল কে পাস’, ‘মেরে সপনো কি রানি’, প্রতিটা গানেই ম্যাজিক আর প্রতিটা গানই হিট। তিনি একদিকে যেমন গায়ক, অভিনেতা, সংগীত পরিচালক, প্রযোজক, পরিচালক, লেখক, এমনকি কৌতুকাভিনেতা, সব মিলিয়ে তিনি গোটা মহাবিশ্ব (Sachin Tendulkar)।
একদিকে প্রথাগত তালিম ছাড়া কিশোর কুমার নিজের রাজ্যপাট গড়ে তুলেছেন অন্যদিকে মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে শুনশান দুপুরে ছোট্ট বালককে খেলা শেখাচ্ছেন একজন। সবাই যখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তখন সেই বালক একা পড়ে থাকত। তাঁর উৎসাহ দেখে সেই ক্রিকেট শিক্ষকও নিজের সেরাটা দিয়ে গড়ে তুললেন ভারতের এই মহারত্নকে। কথা হচ্ছে ক্রিকেটের ঈশ্বর শচীন তেন্ডুলকর আর তাঁর গুরু রমাকান্ত আচরেকরকে নিয়ে। শচীনকে ভারতীয় ক্রিকেটে উপহার দিয়েছেন মুম্বইয়ের ওই শিক্ষকই আর তাঁর এই ছাত্র সারাজীবন তাঁর শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কঠোর অনুশীলন এবং অধ্যাবসায়ের মধ্যে দিয়ে (Sachin Tendulkar)।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে অভিষেক হয় শচীনের। তারপর তাঁর কেরিয়ারে রান আর নতুন নতুন রেকর্ড। নিজের হাতে রেকর্ড ভেঙেছেন এবং রেকর্ড গড়ছেন। আজ এই কিংবদন্তির জন্মদিন। সারা দুনিয়া যাঁকে ক্রিকেটের ঈশ্বর বলেই চেনে। তাঁর ব্যাটিংয়ের সময় গোটা ভারত কার্যত থমকে যেত শুধু ক্লাসিক একটা ইনিংস দেখার আশায়। ২৪ এপ্রিল সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এক আবেগের দিন। কারণ আজ মাস্টার-ব্লাস্টারের জন্মদিন আর তাঁর জীবন ঘিরেই রয়েছে অবিশ্বাস্য সব গল্প।

আজ তাঁর জন্মদিনে এমনই দুটি গল্পের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ক্রিকেট দুনিয়ায় বোলারদের এক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হল মারাত্মক বাউন্সার। বিশেষ করে ব্যাটারদের পরাস্ত করতে পেসারদের ভরসা থাকে এই বাউন্সারের উপর। সেই বলে ব্যাটসম্যানরা পুল-হুক মারেন আর নইলে বল ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিংবদন্তির জন্ম হয় সব বাধা উপেক্ষা করে নিজের দাপটের চিহ্ন রেখে যাওয়ায়। সেই শচীন কী করে মেনে নেবেন বোলারদের এই উপহাস?
সালটা ২০০২, সেই বছর সবাইকে চমকে দেয় একটি শট যা ক্রিকেটে ‘আপার কাট’ নামে পরিচিত। এই শটের প্রণেতা বলা যায় শচীন। এখন সেই শট অনেককেই খেলতে দেখা গেলে সেই সময় খুব একটা চোখে পড়েছে বলে মনে করতে পারবে না ক্রিকেট বিশ্ব। কীভাবে এই শট তিনি শুরু করেছিলেন সেই রহস্য ফাঁস করেছিলেন নিজেই। শচীন বলেন, ‘২০০২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেনে খেলছিলাম আমরা। টেস্ট ম্যাচ ছিল (Sachin Tendulkar)।

দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটে এমনিই বাউন্স বেশি থাকে। মাখায়া এনটিনি বল করছিল। ও এমনিতেই একটু শর্ট অফ লেন্থে বল করত। তাই কাঁধের উচ্চতায় বল থাকত। অফস্টাম্পের বাইরে যে বলগুলো করছিল তার লাইন আমি বুঝতে পারছিলাম। তখনই আমার মনে হল যদি আর একটু উঁচুতে বল থাকে তাহলে কিপার, স্লিপ বা থার্ডম্যানের উপর দিয়ে খেলা যেতে পারে। তারপরেই সেই শট মারি আমি।’ এরপর ক্রিকেটবিশ্ব দেখেছে কীভাবে এই শটকে তিনি শৈল্পিক রূপ দিয়েছিলেন (Sachin Tendulkar)।
কভার-ড্রাইভ বিসর্জন দিয়ে এক মহাকাব্যিক দ্বিশতরান (Sachin Tendulkar)
শচীনের কভার ড্রাইভ দেখা মানে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এক নিখুঁত শিল্পীর তুলির টান দেখা। যিনি আত্মমগ্ন হয়ে নিজের শিল্পকে রূপ দিয়ে যাচ্ছেন আর বাকিরা শুধু অবাক চোখে দেখছেন। কিন্তু সেই কভার ড্রাইভের জন্যও মাস্টার ব্লাস্টারকে পড়তে হয়েছিল বিপদে আর তারপর পণ করেছিলেন ইনিংসে একটিও কভার ড্রাইভ খেলবেন না। দুই ইনিংসে নট আউট থাকার চ্যালেঞ্জ তাঁকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তাঁর ভাই অজিত তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar)।

ব্যাট হাতে সময়টা একদমই ভাল যাচ্ছিল না তাঁর। ২০০৩-০৪ অস্ট্রেলিয়া সফরের সময়। সিডনি টেস্টের আগে পাঁচ ইনিংসে তাঁর স্কোর ০,১,৩৭,০,৪৪। ভারতের অন্যতম সেরা বিদেশ সফরে হাসছে না সেরা ব্যাটারের ব্যাট। যা দলের থেকেও বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে শচীনকে।
রাহুল দ্রাবিড় ও ভিভিএস লক্ষ্মণের নৈপুণ্যে অ্যাডিলেইড টেস্টে জয় পেয়েছিল ভারত। কিন্তু মেলবোর্নে ৯ উইকেটে জিতে সিরিজ সমতায় আনে অস্ট্রেলিয়া। ৪র্থ টেস্ট তাই শচীনের জন্য শেষ সুযোগ ছিল অজিভূমে নিজের ও ভারতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু ততক্ষনে বিপক্ষ তাঁর এই সিরিজের দুর্বল জায়গা ধরে ফেলেছে। ভারতীয় সমর্থকরা যখন অপেক্ষা করছেন শচীনের কাছ থেকে ক্লাসিক ইনিংসের সেই সময় তিনি অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল নিরাপদে উইকেটরক্ষকের হাতে দিয়ে ফিরে আসছেন শচীন। সিরিজে সমতা ফেরানোর পর আজি অহংকার আরও বেড়ে গিয়েছে কিন্তু তাঁরা ধারণা করতে পারেননি ভারতের আসল অস্ত্র শচীন যে নিজেকে তৈরি করছেন অস্ট্রেলিয়া বধ করার আর শচীন সম্পর্কে বোধহয় এই ম্যাচের পরেই বদলে যায় অস্ট্রেলিয়ার ধারণা।
অস্ট্রেলিয়াকে সামনে বারবার জ্বলে ওঠা ভিভিএস লক্ষ্মণ ছিলেন নিজের সেরা ফর্মে। সৌন্দর্যের বিচারে তার সঙ্গে জুটিবদ্ধ শচীনকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অন্যপ্রান্তে শচীন ছিলেন অবিচল, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যতই সবাই আশা করুক যে শচীন অফ স্টাম্পের বাইরে কভার ড্রাইভ মারবেন কিন্তু তিনি পণ করে নেমেছিলেন উইকেট এই ম্যাচে তিনি দেবেন না। অজি বোলার-ফিল্ডাররা ঠাট্টাও করতে শুরু করেছিল, কিন্তু শচীনের একাগ্রতা আর মনোযোগ ভাঙতে পারেননি। অফ স্টাম্পের বল তিনি সোজা ব্যাটে খেলতে থাকেন। এর আগে খুব কমই শচীনকে স্কয়ার লেগ আর মিড অনের মাঝখানে এত শট খেলতে দেখা গিয়েছিলো। নিয়মানুবর্তিতার চরম পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি (Sachin Tendulkar)।
আরও পড়ুন: Tenant Rule: ভাড়াটে কী মালিকের সম্পত্তি দাবি করতে পারে?
পুরো বিশ্ব যখন শচীনের অফ সাইডের নেশায় বুঁদ তখন শচীন নিজেকে বেঁধে ফেলেছেন এক অদৃশ্য বাঁধনে। তিনি অজিদের ফাঁদে পা দেবেন না। সেই দিনের পর শচীন জানিয়েছিলেন যে তিনি নিজেই নিজেকে বলেছিলেন কভার-ড্রাইভ খেলা যাবে না। বছরের পর বছর শৈল্পিক কভার ড্রাইভ খেলা ব্যাটার প্রায় দশ ঘন্টা কাটিয়ে ফেললেন ২২ গজে কিন্তু ড্রাইভ করার চেষ্টাও করলেন না।
এরপর শচীনের অপরাজিত ২৪১ রানের ইনিংসটি ছিল দক্ষতা, ধৈর্য্য ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতিমূর্তি হয়ে থেকে যাবে। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ছিল, শচীন নিজের দুর্বলতাটা চিহ্নিত করেছিলেন এবং অতি আত্মবিশ্বাসী না হয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করেছিলেন। অজি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ শচীনের এই ইনিংসের প্রশংসা করেছেন। লিখেছেন, ‘To me, it was a show of incredible, fortitude, mental strength and discipline.’ শচীনের এই দ্বিশতক নিয়ে ব্রায়ান লারা বলেছেন, ‘This was Sachin’s most disciplined innings.’ তরুণদের কাছে শচীন নিয়ম এবং কঠোর অনুশীলনের রূপরেখা তৈরি করে দেওয়া শিল্পী আর ভক্তদের কাছে যদি ক্রিকেট ‘ধর্ম’ হয় তবে তাঁর ঈশ্বর শচীন (Sachin Tendulkar)।


