Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: অভ্রদীপ দাস: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে (Suvendu Adhikari)। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সংক্রান্ত সংবাদকে সামনে রেখে বিরোধীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। উল্লেখ্য, এসআইআর নিয়ে এর আগেও রাজনৈতিক বিতর্ক এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা সামনে এসেছে।
‘তিন নির্বাচন কমিশনারের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত’ (Suvendu Adhikari)
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। তাঁর দাবি, এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একা নেননি; তিন সদস্যের কমিশন মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের যে ছবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তার ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক নয়—এমনই বক্তব্য তাঁর।
তৃণমূল ও বামেদের অবস্থান নিয়েও আক্রমণ (Suvendu Adhikari)
সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামেদের বর্তমান অবস্থান নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, যে তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে বাম আমলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে, তারাই এখন বিভিন্ন ইস্যুতে বামেদের সঙ্গে একই অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে। বিধানসভায় সাম্প্রতিক ভোটাভুটি ও বিরোধীদের ওয়াকআউটের প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন।
অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাস টেনে তীব্র কটাক্ষ
বক্তব্যে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে শুরু করে বাম আমলের বিভিন্ন বিতর্কিত অধ্যায়ের প্রসঙ্গও টেনে আনেন শুভেন্দু অধিকারী। সাঁইবাড়ি, মরিচঝাঁপি, নন্দীগ্রাম ও নেতাইয়ের মতো ঘটনাগুলির উল্লেখ করে তিনি বামেদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের পুরনো রাজনৈতিক অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে অতীতের সংঘাতের তুলনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রসঙ্গ (Suvendu Adhikari)
এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির আইনি পদক্ষেপের প্রসঙ্গও আসে তাঁর বক্তব্যে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বিহার থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত বিষয়েও রাজনৈতিক দলগুলি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। তিনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২-এর কথাও উল্লেখ করেন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আদালতের ভূমিকার প্রসঙ্গ তোলেন।
আরও পড়ুন: RG Kar Case: আরজি কর মামলায় ফের বিস্ফোরক দাবি নির্যাতিতার মায়ের
এসআইআর নিয়ে রাজনীতির উত্তাপ আরও বাড়ছে
সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে বিরোধীদের প্রশ্ন ও আপত্তি, অন্যদিকে শাসকপক্ষের পাল্টা দাবি—দুইয়ের জেরে এসআইআর ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমশ আরও প্রকাশ্য হচ্ছে। এর মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য—তিনটি দিকই আগামী দিনে এই বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
SIR নিয়ে অপপ্রচার (Suvendu Adhikari)
তৃণমূল-সিপিএমের আঁতাত এবং জনগণের রায় অস্বীকারের অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারীর তীব্র আক্রমণ আজ রাজ্য বিজেপি প্রধান কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী* SIR প্রক্রিয়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম এবং তাদের সহযোগী রাজনৈতিক শক্তিগুলির বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ যে স্পষ্ট রায় দিয়েছেন, সেই রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যে নির্বাচনে মানুষ আমাদের বিপুল ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেই নির্বাচনের ফলাফলকেই অস্বীকার করার চেষ্টা হচ্ছে। SIR এবং নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়াকে নিয়ে এমনভাবে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, যেন গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার উপরেই মানুষের আস্থা নষ্ট করা যায়।”
তিনি বলেন, SIR-এর সিদ্ধান্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এককভাবে নেননি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের যৌথ বক্তব্য থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর কথায়, “SIR সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। তাই একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক প্রচার চলছে, তার কোনও ভিত্তি নেই।”
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে SIR-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে একাধিক বিষয়ে শুনানি ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “যে বিষয় নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেরাই সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল, আদালতের নির্দেশে যে প্রক্রিয়া হয়েছে, আজ সেই বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়াকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “কেরালায় SIR ভালো, কারণ সেখানে রাজনৈতিক সমীকরণ অন্যরকম; আর পশ্চিমবঙ্গে SIR খারাপ—এই দ্বিচারিতা মানুষ বুঝতে পারছে।”
তৃণমূল-সিপিএমের সম্পর্ক নিয়ে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যে তৃণমূল কংগ্রেস একসময় সিপিএমের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছিল, আজ সেই দলই সিপিএমের সঙ্গে একযোগে আন্দোলন করছে।
তিনি বলেন, “যে সিপিএমের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল, আজ সেই সিপিএমই তাদের রাজনৈতিক সঙ্গী হয়ে উঠেছে। বিধানসভা থেকে শুরু করে রাস্তায়—এই রাজনৈতিক সমঝোতার ছবি মানুষ দেখতে পাচ্ছে।”
শ্রী অধিকারী আরও বলেন, সম্প্রতি বিধানসভায় একটি ভোটাভুটির সময় তৃণমূলের একটি অংশ এবং সিপিএমের একমাত্র বিধায়কের একই অবস্থানে থাকার ঘটনাও এই রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত বহন করে।
শ্রীরামপুরের সভা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে বিপুল আন্দোলনের দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে তার সঙ্গে জনসমর্থনের কোনও সামঞ্জস্য দেখা যায়নি। তাঁর দাবি, “শ্রীরামপুরে যে সভা হয়েছে, সেখানে মানুষের উপস্থিতিই বলে দিয়েছে এই তথাকথিত আন্দোলনের বাস্তব ভিত্তি কতটা।”
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যারা একসময় পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, আজ তাদের জনভিত্তি কোথায়? আর যারা সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছিল, তারাই আজ সিপিএমের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।”
মমতা এআইটিসি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়েও মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “নাম বদলেছে, প্রতীক বদলেছে এবং দলও একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।”
SIR নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “মানুষের দেওয়া বিপুল ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করার চেষ্টা আসলে গণতান্ত্রিক রায়কে অসম্মান করার শামিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুর্নীতি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হওয়ার কারণে বিরোধীরা রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে। আবাস যোজনা, সামাজিক সুরক্ষা, নিয়োগ, কয়লা-বালি, গবাদি পশু পাচার এবং অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “এই সমস্ত বিষয় থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই SIR নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।”
বিচারবিভাগকে আক্রমণের অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “SIR-এর নামে নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করতে গিয়ে এমন একটি প্রক্রিয়াকেও প্রশ্ন করা হচ্ছে, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ভূমিকা রয়েছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও বলেন, “যে ২৭ লক্ষ নাম নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়ায় বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ভূমিকা ছিল। তাঁদের নিয়োগ ও ক্ষমতার পিছনে আদালতের নির্দেশ রয়েছে। সুতরাং মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে এর সম্পূর্ণ দায় নির্বাচন কমিশন বা বিজেপির উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।”
কেরালা প্রসঙ্গে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যদি SIR সত্যিই গণতন্ত্রবিরোধী হয়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বামপন্থীদের কেরালাতেও একইভাবে আন্দোলন করা উচিত।
তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে SIR নিয়ে আন্দোলন হবে, কিন্তু কেরালায় হবে না—এই দ্বিচারিতা কেন? কেরালাতেও একই প্রশ্ন নিয়ে আন্দোলন করুন। সেখানে আপনাদের রাজনৈতিক সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামুন।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সেই তৃণমূলই আজ সিপিএমের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে হাত মেলাচ্ছে। বাংলার মানুষ এই পরিবর্তন দেখছে।”
তিনি বলেন, “SIR নিয়ে মিথ্যা প্রচার, নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ এবং মানুষের দেওয়া রায়কে অস্বীকার করার রাজনীতি বেশিদিন চলবে না। বাংলার মানুষ সবকিছু দেখছে।”
শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই প্রেস কনফারেন্সের উদ্দেশ্য একটাই—SIR নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তার প্রকৃত তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে সম্মান করার আহ্বান জানানো।”



