Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চলেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক প্রাচীন পরিকল্পনা—তাই খাল, যা ‘ক্রা খাল’ নামেও পরিচিত (Thai Canal)। দক্ষিণ তাইল্যান্ডের মালয় উপদ্বীপে খননযোগ্য এই খাল যদি বাস্তবের মুখ দেখে, তবে মলাক্কা প্রণালীকে পাশ কাটিয়ে আন্দামান সাগর ও তাইল্যান্ড উপসাগরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে উঠবে। ফলে ১২০০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ বাঁচবে, কমবে জ্বালানি ও সময়ের খরচ, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় এক বিপ্লব এনে দিতে পারে।
খাল খননের প্রস্তাব (Thai Canal)
তবে এই পরিকল্পনা এক দিনের নয় (Thai Canal)। খাল খননের প্রস্তাব প্রথম আসে ১৬৭৭ সালে, থাই রাজা নারাইয়ের আমলে। ফরাসি প্রকৌশলী লামার জরিপ চালিয়ে জানান, মালয় উপদ্বীপের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য—পাহাড়, ঘন জঙ্গল—খাল খননে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ১৯ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও একই কারণে প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসে। কিন্তু ২১ শতকে এসে, নতুন প্রযুক্তি ও বৃহৎ বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষার জেরে চিন ফের খাল প্রকল্পকে জীবন্ত করে তুলেছে।
কৌশলগত স্থান (Thai Canal)
চিনের এই আগ্রহ নিছক বাণিজ্যিক নয়—এটি তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ কৌশলের অংশ (Thai Canal)। মালয় উপদ্বীপে খাল খনন করে তারা শুধুমাত্র নিজেদের পণ্যবাহী জাহাজগুলির পথ সংক্ষিপ্ত করবে না, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের নৌবাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করবে। মলাক্কা প্রণালী বর্তমানে চিনের অন্যতম দুর্বল কৌশলগত স্থান। আমেরিকার (Donald Trump) সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে মলাক্কা প্রণালী বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে চিনের আমদানি-রপ্তানি কার্যত থমকে যাবে। এই বাস্তবতায় চিন বিকল্প জলপথ খুঁজছে—তাই খাল সেই বিকল্প।

আরও পড়ুন: Panama Canal :পানামা খালে চিনা প্রভাবের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল আমেরিকা!
কতটা দীর্ঘ হবে এই খাল? (Thai Canal)
তাই খালের সম্ভাব্য রুট ‘নাইন-এ’ রুটটি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বলে বিবেচিত হচ্ছে। এটি আন্দামান উপকূলের ক্রাবি থেকে শুরু হয়ে তাইল্যান্ড উপসাগরের সোংখলা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১২৮ কিমি, প্রস্থ ৪০০ মিটার এবং গভীরতা ৩০ মিটার—এমন খাল দিয়ে বড় পণ্যবাহী জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে।

ভারতের উপর প্রভাব (Thai Canal)
এই খাল যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি তীব্র ধাক্কা খেতে পারে (Thai Canal)। কারণ, সিঙ্গাপুর মূলত মলাক্কা প্রণালীকেন্দ্রিক বাণিজ্যে নির্ভরশীল। অপরদিকে, ভারতের (Narendra Modi) ক্ষেত্রেও এটি দ্বিমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে ভারতের জন্য খুলে যাবে বিকল্প রপ্তানিপথ—পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমবে। অন্যদিকে, যদি এই খাল চিনা নৌসেনার ব্যবহারযোগ্য হয়, তবে তা ভারতের আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত চাপ বাড়াবে। এই অঞ্চল বরাবরই ভারতীয় নৌবাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণাধীন, যা বিঘ্নিত হতে পারে।
দুর্গম এলাকায় অবস্থান (Thai Canal)
পরিবেশগত দিক দিয়েও খালটি বেশ দুর্গম এলাকায় অবস্থান করবে। মালয় উপদ্বীপের ঘন অরণ্য ও পাহাড়ি অঞ্চল ধ্বংসের মুখে পড়বে। বন্যপ্রাণ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে প্রকল্পটি। বিশাল পরিমাণ মাটি ও পাথর সরানোর জন্য প্রয়োজন হতে পারে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করারও।তবে খাল খননের সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত নয়। তাইল্যান্ড সরকার একটি স্টাডি গ্রুপ গঠন করেছে—‘তাই ক্যানাল অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টাডি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, যারা এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তাদের প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, খাল খননের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে, এবং দক্ষিণ তাইল্যান্ডে শিল্প-অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।
হিংস্র নরম শক্তি প্রয়োগ (Thai Canal)
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তাইল্যান্ড আদৌ চিনকে (Xi Jinping) এই প্রকল্প দেবে কি না! কারণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশের সঙ্গেই চিনের সম্পর্ক বিতর্কিত। তারা চিনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকে অনেক সময় ‘হিংস্র নরম শক্তি প্রয়োগ’ বলেই মনে করে। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই খাল শুধু একটি জলপথ নয়—এটি এশিয়ার ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি মোড়। ভারতের জন্য এটি যেমন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে, তেমনই কৌশলগত চাপও বাড়াতে পারে। তাই প্রয়োজন যথাযথ কূটনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি, যাতে উপকার নেওয়া যায়, কিন্তু নিরাপত্তা বজায় রেখে।


