Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম’ শুধু একটি গান নয় (Vande Mataram), এটি এক আত্মার আহ্বান এক রণধ্বনি, যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসংখ্য বিপ্লবীর হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা। “মা, তোমাকে বন্দনা করি” এই সহজ বাক্যটিতে লুকিয়ে ছিল মাটির টান, মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও দেশের জন্য আত্মোৎসর্গের আহ্বান। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮২ সালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ-এ অন্তর্ভুক্ত করেন এই গানটি। কিন্তু গানটি তার বহু আগেই লেখা প্রায় ১৮৭৪ সালে, মুর্শিদাবাদের লালগোলা রাজবাড়ির অতিথিশালায়, এমনই ধারণা বহু ঐতিহাসিকের।
ইতিহাসের পাতায় ফিরে দেখা (Vande Mataram)
বঙ্কিমচন্দ্র সেই সময় মুর্শিদাবাদে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮৭৩ সালে বহরমপুর ব্যারাক স্কোয়ারের কাছে এক ব্রিটিশ কর্নেলের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ ঘটে, যা পরে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের রায়ে বঙ্কিমচন্দ্র জয়লাভ করেন এবং কর্নেলকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়। তবে এই ঘটনার পর ব্রিটিশদের প্রতিশোধের আশঙ্কায় লালগোলার মহারাজা রাও যোগীন্দ্র নারায়ণ রায় তাঁকে নিরাপত্তার আশ্রয় দেন। লালগোলার রাজবাড়িতেই তিনি কিছুদিন অবস্থান করেন, আর সেই সময়েই ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি “বন্দে মাতরম” জন্ম নেয়।

মাতৃরূপের তিন প্রতীক (Vande Mataram)
‘বন্দে মাতরম ও আনন্দমঠের উৎসভূমি লালগোলা’-র লেখক সুমন কুমার মিত্র-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বঙ্কিমচন্দ্র লালগোলার রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী, কালী ও দুর্গা এই তিন মাতৃরূপের মূর্তি দেখে অনুপ্রাণিত হন। তিনি তিন রূপে মাকে দেখেছিলেন, জগদ্ধাত্রী: মুক্ত মাতৃরূপ, ‘মা যা ছিলেন’। শৃঙ্খলিত কালী: পরাধীন ভারতের প্রতীক, ‘মা যা হয়েছেন’। দুর্গা: ভবিষ্যতের মুক্ত ভারতের প্রতীক, ‘মা যা হইবেন’। এই প্রতীকী ভাবনাই আনন্দমঠ-এর অন্তর্গত ত্রিমাত্রিক মাতৃরূপের ধারণার ভিত্তি। এমন ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণাই ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতিটি শব্দে মিশে আছে।
১৮৭৪ সালের ঐতিহাসিক প্রমাণ (Vande Mataram)
গানের একটি লাইনে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, “সপ্ত কোটি কণ্ঠ কলকল নিনাদ করালে” ১৮৭১ সালের জনগণনা অনুযায়ী বাংলার জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৯৫ লক্ষ, যা ১৮৭৪ সালে দাঁড়ায় প্রায় ৭ কোটি। অর্থাৎ গানের এই উল্লেখ স্পষ্ট করে যে গানটি ১৮৭৪ সালে রচিত, এবং সেই সময় বঙ্কিমচন্দ্র লালগোলাতেই ছিলেন।
আজ ধ্বংসপ্রায় (Vande Mataram)
লালগোলা রাজবাড়ির কালীবাড়ির ডানদিকের দোতলা ঘরেই নাকি তিনি বসে লেখালিখি করতেন। কিন্তু আজ সেই ঐতিহাসিক ঘর ভেঙে পড়েছে, সিঁড়িও নেই। যে অতিথি নিবাসে (১৮৬৮ সালে নির্মিত) তিনি দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন, সেটিও এখন ধ্বংসপ্রায়। একসময় সেটি লালগোলার বিডিও অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দু’বার আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) ‘সার্ভে’ করলেও আজও সেখানে কোনো সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
‘বন্দে মাতরম’-এর সুতিকাগার অন্ধকারে (Vande Mataram)
লালগোলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, যেখানে বসে বঙ্কিমচন্দ্র এই কালজয়ী গানটি লিখেছিলেন, সেখানে আজও কোনো মূর্তি নেই, নেই কোনো স্মারক ফলক। শুধু রাজবাড়ির দেওয়ালে একটি অঙ্কিত প্রতিকৃতি, যার সামনে আজও প্রদীপ জ্বেলে মানুষ শ্রদ্ধা জানায়। মুর্শিদাবাদ জেলা ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্রের সম্পাদক অরিন্দম রায় বলেন, “দেশজুড়ে ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর উদযাপিত হচ্ছে, কিন্তু তার জন্মভূমি লালগোলা আজও প্রচারের আলোয় আসেনি।” তিনি আরও প্রস্তাব দেন, লালগোলায় যেখানে গানটি লেখা হয়েছিল সেখানে একটি আবক্ষ মূর্তি ও তথ্যচিত্র কেন্দ্র স্থাপন করলে তা হবে প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রন্তিদেব সেনগুপ্তর পর্যবেক্ষণ (Vande Mataram)
প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বলেন, “আজকের রাজনীতি ‘বন্দে মাতরম’-এর নাম ব্যবহার করছে দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যারা এখন এর মাহাত্ম্য প্রচার করছে, তাদের পূর্বসূরিরা ব্রিটিশদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল।” তিনি আরও বলেন “আমরা ‘হেরিটেজ’ রক্ষায় ভীষণ উদাসীন। কলকাতায় মধুসূদন দত্ত বা দীনবন্ধু মিত্রর বাড়ির অবস্থা যেমন, তেমনই লালগোলার রাজবাড়িরও অবস্থা করুণ।”
আরও পড়ুন: Shani Margi 2025: শনি দেবের মীন রাশিতে গমন, ২০২৬ পর্যন্ত ভাগ্য উজ্জ্বল হবে এই পাঁচ রাশির!
প্রয়োজন জাতীয় উদ্যোগের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা অনুযায়ী, ‘বন্দে মাতরম’-এর সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে বছরজুড়ে দেশজুড়ে নানা অনুষ্ঠান হবে।
কিন্তু লালগোলা, যে মাটিতে এই গানের জন্ম, সেই স্থানকে যদি জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তবে উদযাপন অপূর্ণই থেকে যাবে। একটি ছোট্ট উদ্যোগ ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ, একটি তথ্যকেন্দ্র, একটি স্মারক মূর্তি এই তিনটিই পারে লালগোলাকে ভারতীয় স্বাধীনতার মানচিত্রে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে।



