Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল তামিলনাড়ু (Vijay)। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সরকার গঠনকে ঘিরে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রবিবার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয়। রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত জমকালো অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল আর. এন. রবি-এর পরিবর্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার। শপথ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী ত্রিশা কৃষ্ণান, যাঁকে ঘিরে বহুদিন ধরেই বিজয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী-সহ একাধিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
স্টেডিয়ামে ‘বিজয়-ম্যাজিক (Vijay)
রবিবার সকাল থেকেই চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামের বাইরে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজার হাজার সমর্থক। তাঁদের হাতে ছিল টিভিকে-র পতাকা, বিজয়ের বিশাল কাটআউট এবং পোস্টার। সিনেমার নায়ককে বাস্তবের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে বসতে দেখার উত্তেজনায় কার্যত উৎসবের আবহ তৈরি হয় গোটা এলাকায়। সাদা শার্ট, কালো ব্লেজার এবং কালো ট্রাউজারে সজ্জিত বিজয় যখন স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, তখন সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে। “থলপতি! থলপতি!” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা স্টেডিয়াম।
মঞ্চে উঠে তামিল ভাষায় শপথবাক্য পাঠ শুরু করেন তিনি। “আমি শ্রী জোসেফ বিজয়…” এই কয়েকটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই করতালিতে ফেটে পড়েন উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ। বহু সমর্থকের চোখে দেখা যায় আবেগের জল। দক্ষিণী সিনেমার সুপারস্টার থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের এই যাত্রাপথ যেন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।

অভিনন্দন জানালেন প্রধানমন্ত্রী মোদি (Vijay)
মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পরই বিজয়কে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণের আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এটি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। গত ছ’দশকে এমন কোনও মুখ্যমন্ত্রী দেখা যায়নি যিনি দ্রাবিড় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বাইরের পরিচয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। সেই জায়গা থেকেই বিজয়ের উত্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সংখ্যার অঙ্কে টানটান নাটক (Vijay)
২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থন। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, কোনও দল বা জোট এককভাবে সেই জাদু সংখ্যা স্পর্শ করতে পারেনি। বিজয়ের দল টিভিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তাদের আসন সংখ্যা ছিল ১০৮। বিজয় নিজে দুটি আসনে জয়ী হওয়ায় কার্যকর বিধায়ক সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৭। এই অবস্থায় সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয় প্রবল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। গত চার দিন ধরে চলতে থাকে দফায় দফায় বৈঠক। বিজয় অন্তত তিনবার রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু রাজ্যপাল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া সরকার গঠনের আমন্ত্রণ দেওয়া হবে না। ফলে চাপ ক্রমশ বাড়ছিল বিজয়ের উপর।
সমর্থনের হাত (Vijay)
রাজনৈতিক সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যায় গত কয়েক দিনে। প্রথমে কংগ্রেসের পাঁচ বিধায়ক টিভিকে-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দুই বাম দলের চার বিধায়কও বিজয়ের পাশে দাঁড়ান। তবুও প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূরণ হচ্ছিল না। অবশেষে শনিবার গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। দুই ভিসিকে বিধায়ক এবং দুই আইইউএমএল বিধায়ক নিঃশর্ত সমর্থন ঘোষণা করেন বিজয়ের প্রতি। এরপরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয় টিভিকে-র। রাজ্যপাল জানিয়ে দেন, সরকার গঠনে আর কোনও সাংবিধানিক বাধা নেই। আর সেই পথ ধরেই রবিবার শপথ নিয়ে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন বিজয়।
মন্ত্রিসভায় চমক (Vijay)
বিজয়ের সঙ্গে এদিন আরও ন’জন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাগত ক্ষেত্রের পরিচিত মুখ। শপথ নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন কেএ সেনগোত্তাইয়ান, আধব অর্জুন, নির্মল কুমার, এন আনন্দ, অভিনেতা রাজ মোহন, চিকিৎসক টিকে প্রভু, প্রাক্তন আইআরএস আধিকারিক অরুণ রাজ, পি ভেঙ্কটারামনন, কীর্তনা যিনি এই মন্ত্রিসভার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য বিশেষ করে কীর্তনার অন্তর্ভুক্তি নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার বার্তা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

আরও পড়ুন: Khudiram Tudu: যাঁর গ্রামেই নেই উন্নয়ন, তিনিই এবার উন্নয়নের মুখ ক্ষুদিরাম টুডু
সিনেমার পর্দা থেকে ক্ষমতার মসনদ
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা বহুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সামাজিক কাজ, যুব সমাজের সঙ্গে সংযোগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য তাঁকে ধীরে ধীরে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। তামিল রাজনীতিতে সিনেমা ও রাজনীতির সম্পর্ক নতুন নয়। এম জি রামচন্দ্রন, জে জয়ললিতা-দের মতো তারকারাও একসময় ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। তবে বিজয়ের উত্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দীর্ঘ আধিপত্যের মাঝে এক নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে টিভিকে। আর সেই দলের মুখ হয়েই এখন রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব হাতে নিলেন থলপতি বিজয়।



