Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্নে ভারত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনের জন্মভূমি ( World Environment Day)। পরিবেশ সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে যে ধরনের জনআন্দোলন গত তিন শতাব্দীতে ভারতে গড়ে উঠেছে, তার অনেকগুলিই আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়। রাজস্থানের মরুভূমিতে একটি গাছকে বাঁচাতে শত শত মানুষের আত্মত্যাগ, হিমালয়ের পাদদেশে গ্রামীণ নারীদের গাছ জড়িয়ে ধরে বনরক্ষার লড়াই, নদী ও পাহাড়কে রক্ষার দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলন সব মিলিয়ে ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস এক অনন্য অধ্যায়। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ফিরে দেখা যাক সেই ইতিহাস, যে ইতিহাস আজও পরিবেশ, উন্নয়ন এবং মানুষের অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ককে প্রভাবিত করে।

খেজরলি আন্দোলন ( World Environment Day)
পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৭৩০ সালে। রাজস্থানের যোধপুরের কাছে খেজরলি গ্রামের ঘটনা আজও বিস্ময় জাগায়। তৎকালীন শাসকের নির্দেশে প্রাসাদ নির্মাণের জন্য খেজরি গাছ কাটতে আসেন রাজকর্মচারীরা। কিন্তু বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ গাছ কাটতে দিতে রাজি হননি। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতি ও জীবজগতের সুরক্ষা ধর্মীয় কর্তব্যের অংশ। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন অমৃতা দেবী বিষ্ণোই। তিনি গাছকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়েন। একে একে তাঁর তিন কন্যা এবং আরও শত শত গ্রামবাসী একইভাবে প্রতিবাদে সামিল হন। শেষ পর্যন্ত ৩৬৩ জন মানুষ প্রাণ হারান। পরিবেশ ইতিহাসবিদদের মতে, এটি পৃথিবীর প্রথম দিকের সংগঠিত বৃক্ষরক্ষা আন্দোলনগুলোর অন্যতম। আজও রাজস্থানে প্রতি বছর এই আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়।
চিপকো আন্দোলন ( World Environment Day)
১৯৭০-এর দশকে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে দ্রুত হারে বন উজাড় শুরু হয়। বড় বড় ঠিকাদারি সংস্থা বনভূমি থেকে কাঠ সংগ্রহ করছিল। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস, জলসংকট ও কৃষিক্ষেত্রে সমস্যা বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে জন্ম নেয় চিপকো আন্দোলন। ১৯৭৩ সালে চামোলি জেলার মণ্ডল গ্রামে স্থানীয় মানুষ বনভূমি রক্ষার দাবিতে গাছকে আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে পড়েন। পরে ১৯৭৪ সালে রেনি গ্রামে গৌরা দেবীর নেতৃত্বে কয়েক ডজন মহিলা একইভাবে গাছকে জড়িয়ে ধরে কাঠুরিয়াদের বাধা দেন।
চিপকো আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন সুন্দরলাল বহুগুণা এবং চণ্ডীপ্রসাদ ভাট। তবে গবেষকদের মতে, এই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি ছিলেন পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ নারীরা। চিপকো আন্দোলনের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে পরবর্তীকালে হিমালয় অঞ্চলে বৃক্ষনিধনের উপর দীর্ঘমেয়াদি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

সাইলেন্ট ভ্যালি ( World Environment Day)
কেরালার সাইলেন্ট ভ্যালি ছিল ভারতের শেষ অবশিষ্ট উষ্ণমণ্ডলীয় চিরসবুজ অরণ্যগুলোর একটি। ১৯৭০-এর দশকে সেখানে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ার প্রস্তাব আসে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিজ্ঞানী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ছাত্রছাত্রী এবং পরিবেশকর্মীরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা শুরু করেন। আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৮৩ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয় এবং পরবর্তীতে সাইলেন্ট ভ্যালি জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন ( World Environment Day)
নর্মদা নদীর উপর বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি শুরু হয় নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন। মেধা পাটকর, বাবা আমটে এবং আরও বহু সমাজকর্মী এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হবেন; বিপুল বনভূমি জলের তলায় চলে যাবে; নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবিকা ধ্বংস হবে। অন্যদিকে সরকার ও সমর্থকদের যুক্তি ছিল, বাঁধ প্রকল্প কৃষি, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই আন্দোলন ভারতের উন্নয়ন মডেল নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করে।

অ্যাপিকো আন্দোলন ( World Environment Day)
চিপকো আন্দোলনের প্রেরণায় ১৯৮৩ সালে কর্ণাটকের উত্তর কন্নড় জেলায় শুরু হয় অ্যাপিকো আন্দোলন। স্থানীয় মানুষ বন উজাড়ের বিরুদ্ধে গাছ জড়িয়ে ধরে প্রতিবাদ জানান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বনসম্পদের টেকসই ব্যবহার। এই আন্দোলন পশ্চিমঘাট অঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
নিয়ামগিরি আন্দোলন
ওড়িশার নিয়ামগিরি পাহাড় শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি ডোংরিয়া কোন্ধ আদিবাসীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র। ২০০০-এর দশকে পাহাড়ে বক্সাইট খনির পরিকল্পনা হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রতিবাদ শুরু করে।
তাঁদের বক্তব্য ছিল পাহাড় ধ্বংস হলে বন, নদী, জীববৈচিত্র্য এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। বহু বছর ধরে চলা আন্দোলনের ফলে গ্রামসভাগুলির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। নিয়ামগিরি আন্দোলন পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকারের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়।
আরও পড়ুন: Police Assault Case: উত্তপ্ত ভাঙড়,অবৈধ নির্মাণ রুখতে গিয়ে আক্রান্ত কলকাতা পুলিশ!
নগরের বুকে সবুজের জন্য সংগ্রাম
পরিবেশ আন্দোলন যে শুধু গ্রাম বা পাহাড়ে সীমাবদ্ধ নয়, তার অন্যতম উদাহরণ মুম্বইয়ের আরে বন আন্দোলন। মেট্রো প্রকল্পের জন্য হাজার হাজার গাছ কাটার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ, ছাত্রছাত্রী, শিল্পী, বিজ্ঞানী এবং পরিবেশকর্মীরা একত্রিত হন।
সামাজিক মাধ্যম এই আন্দোলনকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।



