Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার পুলিশের উপর ভরসা নেই’, ‘প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাব’—একাধিক ইস্যুতে একসঙ্গে আক্রমণ, তৃণমূলকে ফের ক্ষমতায় ফেরানোর বার্তাও মমতার (Mamata Banerjee), রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ফের সরব হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধিক ইস্যুকে সামনে রেখে বিজেপি এবং রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ দাগলেন তিনি।

পুলিশি ভূমিকা (Mamata Banerjee)
মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে গ্রেফতার, SIR, ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান, ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনা, ছাত্র রাজনীতি, মিড ডে মিল থেকে শুরু করে বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচি—প্রায় প্রতিটি বিষয়েই তাঁর বক্তব্যে উঠে এল তীব্র আক্রমণের সুর। একই সঙ্গে তৃণমূল খুব শীঘ্রই ক্ষমতায় ফিরবে বলেও আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, রাজনৈতিক লড়াই থেকে তিনি পিছিয়ে যাবেন না। বরং এবার জেলা সফর শুরু করবেন এবং তাঁকে আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই বলেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি।
‘বিজেপি যা বলবে, তার উল্টোটা করব’
বক্তব্যের শুরুতেই বিজেপিকে নিশানা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিজেপি যা বলবে, তার উল্টোটা করার রাজনৈতিক অবস্থান নেবে তৃণমূল। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতকে তিনি সরাসরি তৃণমূল বনাম বিজেপির লড়াই হিসেবেই দেখছেন। বিজেপিকে ‘হাই ভোল্টেজ ভাইরাস’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে অত্যাচার, দমন-পীড়ন এবং মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি জড়িয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে তৃণমূল রাজনৈতিকভাবে লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও বার্তা দেন তিনি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ (Mamata Banerjee)
মমতার বক্তব্যের অন্যতম বড় অংশ জুড়ে ছিল রাজ্য পুলিশের ভূমিকা। তাঁর দাবি, তিনি যে পুলিশকে নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, সেই পুলিশ মানবিকতার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়াত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সেই পুলিশকে চিনতে পারছেন না। পুলিশের বিরুদ্ধে বুলডোজার অভিযান চালানোর অভিযোগ তুলে তাঁর প্রশ্ন—পুলিশের কাজ কি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নাকি সাধারণ মানুষের উপর প্রশাসনিক চাপ তৈরি করা? কালীঘাট থানার এক আধিকারিকের বিরুদ্ধে এক যুবককে তৃণমূল করার জন্য ধমক দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা বক্তব্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, রাজনৈতিক মঞ্চে তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
‘বাংলার পুলিশের উপর ভরসা নেই’ (Mamata Banerjee)
রাজ্য পুলিশের উপর আস্থা নেই বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ চাই। এখানেই শেষ নয়, তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশের একাংশ রাজনৈতিক নির্দেশে কাজ করছে। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কি তৃণমূল নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হচ্ছে?
SIR নিয়ে ফের সরব মমতা (Mamata Banerjee)
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া SIR নিয়েও তীব্র আক্রমণ করেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, SIR-এর নামে ভোট লুঠের চেষ্টা চলছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। সেই বিতর্কের মধ্যেই মমতার বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি স্পষ্ট করে দেন, SIR-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি—দুই পথেই লড়াই চালানো হবে। প্রয়োজনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
ছাতা মাথার উপর থাকবে না, মানুষের উপর থাকবে’
বক্তব্যে একাধিক রূপক ও রাজনৈতিক কটাক্ষ ব্যবহার করেন মমতা। প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে ‘ছাতা’ প্রসঙ্গ টেনে তাঁর মন্তব্য, ছাতা কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাথার উপর থাকবে না, মানুষের উপর থাকবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিবর্তে জনসমর্থনকেই রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ক্যামাক স্ট্রিট নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন (Mamata Banerjee)
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও সরব হন মমতা। হোডিং খোলার জন্য গ্যাস কাটার কেন ব্যবহার করা হয়েছিল, কেন গ্রেফতার করা হল এবং যথাযথ নোটিস দেওয়া হয়েছিল কি না এই প্রশ্নগুলি তোলেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, অন্য রাজনৈতিক দলের হোডিংয়ের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রশাসনের পদক্ষেপ যদি রাজনৈতিকভাবে বেছে বেছে করা হয়, তাহলে তার বিরোধিতা করবে তৃণমূল।
ছাত্র রাজনীতি দমন করা যায় না (Mamata Banerjee)
ছাত্র রাজনীতি নিয়েও জোরালো অবস্থান নেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, ছাত্র রাজনীতিকে দমন করা যায় না। ছাত্র সংসদ নির্বাচন, ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার মধ্যেই এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রশাসনিক চাপ দিয়ে ছাত্রদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

বাচ্চাদের দুধ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে’ (Mamata Banerjee)
মিড ডে মিল নিয়েও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মমতা। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের সন্তানদের জন্য বরাদ্দ খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের খাবার ও জীবনযাপন নিয়ে তুলনা টেনে তিনি রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ সামনে আনেন। ‘আপনি রুই, কাতলা, পাবদা খাবেন আর বাংলার মানুষ কী খাবে?’ এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে শাসকদের জীবনযাত্রার তুলনা টেনে রাজনৈতিক আক্রমণ শানান তিনি।
৪০ গাড়ির কনভয়’ (Mamata Banerjee)
ক্ষমতাসীনদের কনভয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কটাক্ষ করেন মমতা। তাঁর দাবি, তিনি নিজে এত বড় কনভয় ব্যবহার করতেন না। এই প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা তৈরি করে বড় কনভয় নিয়ে চলাফেরা করা হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে তাঁর প্রশ্ন সাধারণ মানুষের রাস্তা বন্ধ করে ভিআইপি চলাচল কতটা যুক্তিসঙ্গত?

ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব
ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে মমতার অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। তিনি বলেন, ফুটপাত খালি করতে আপত্তি নেই, কিন্তু তার আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যতদিন পুনর্বাসন করা সম্ভব না হচ্ছে, ততদিন ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—হকার বা ফুটপাত-নির্ভর মানুষের জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও প্রশাসনিক অভিযানের পাশাপাশি গুরুত্ব পেতে হবে।
বই চুরির অভিযোগ নিয়েও পাল্টা চ্যালেঞ্জ (Mamata Banerjee)
নিজের বিরুদ্ধে বই চুরির অভিযোগ প্রসঙ্গেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এমন পরিস্থিতি তাঁর জীবনে আসেনি যে লাইব্রেরি থেকে বই চুরি করতে হবে। প্রয়োজনে তিনি নিজেই বইয়ের লাইব্রেরি তৈরি করে দেওয়ার কথাও বলেন।
মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ (Mamata Banerjee)
মমতার বক্তব্যে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর অভিযোগ, যে মিডিয়া তাঁকে বা তাঁর দলকে সমর্থন করে, তাকে প্রশংসা করা হয়; আর যারা সমর্থন করে না, তাদের ‘গদ্দার’ বলা হয়। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের বিতর্ককেও সামনে নিয়ে আসেন।
‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিন, নইলে ভাণ্ডার খুলব’
নারীকল্যাণ প্রকল্প ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও সরব হন মমতা। তাঁর বক্তব্যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর প্রসঙ্গ উঠে আসে। রাজ্যের জনপ্রিয় এই প্রকল্পকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি সাধারণ মহিলাদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
‘জনগণের পারমিশন নেব’ (Mamata Banerjee)
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ভবিষ্যতে সভা করার জন্য শুধু আদালতের অনুমতির উপর নির্ভর করবেন না; জনগণের অনুমতিই তাঁর কাছে বড়। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক লড়াইকে সরাসরি জনতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক রাজনীতির চূড়ান্ত শক্তি জনগণের সমর্থন।
‘তৃণমূল খুব শীঘ্রই ক্ষমতায় ফিরবে’
সমস্ত আক্রমণের শেষে মমতার বক্তব্যে উঠে এসেছে তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনের দাবি। তাঁর কথায়, তৃণমূলকে ভয় পাওয়ার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে এত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তৃণমূল খুব শীঘ্রই ক্ষমতায় ফিরবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে জানান, এবার তিনি জেলা সফর শুরু করবেন।
পারলে আমাকে আটকে দেখাক’ (Mamata Banerjee)
জেলা সফর নিয়ে কার্যত প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি পিছিয়ে যাবেন না। এরপর দিল্লি যাওয়ার কথাও বলেন তিনি। অর্থাৎ রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাতকে জাতীয় স্তরেও নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিত রয়েছে তাঁর বক্তব্যে।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে আন্তর্জাতিক আদালত
রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি আইনি লড়াইকেও গুরুত্ব দিয়েছেন মমতা। তাঁর বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রসঙ্গ যেমন এসেছে, তেমনই প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। ফলে SIR, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে আগামী দিনে একাধিক আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Nepal China: নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: চিনের দিকে আঙুল, অভিযোগ উড়িয়ে মুখ খুলল বেইজিং
সব মিলিয়ে বার্তা একটাই
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ বক্তব্যে কার্যত একাধিক রাজনৈতিক ইস্যু এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে। পুলিশি ভূমিকা, SIR, ক্যামাক স্ট্রিট, ফুটপাত উচ্ছেদ, ছাত্র রাজনীতি, মিড ডে মিল, মিডিয়ার ভূমিকা এবং বিজেপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—প্রতিটি বিষয়েই তিনি তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাওয়ার বদলে আরও সক্রিয় হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। জেলা সফর শুরু করা, প্রয়োজনে আদালতে যাওয়া এবং তৃণমূলকে ফের ক্ষমতায় আনার প্রত্যয়—সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্যে আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।



