Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: প্রশ্নফাঁস বিতর্ক, মানসিক চাপ ও নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই তিনকে কেন্দ্র করে রবিবার অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা (NEET-UG 2026)-এর পুনঃপরীক্ষা। একদিকে যেমন ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী নতুন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াইয়ে নামছেন, অন্যদিকে পরীক্ষার আগেই এক পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নিট পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হয়েছে এক জটিল সামাজিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতা।

পরীক্ষার আগেই নিভে গেল এক স্বপ্ন (NEET-UG 2026)
উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের ২২ বছরের যুবক যতীন কুমার দীর্ঘদিন ধরে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। সেই লক্ষ্যেই বছরের পর বছর ধরে তিনি NEET পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। একাধিকবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, পড়াশোনার জন্য কখনও বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে তাঁর উপর কোনও অতিরিক্ত চাপ ছিল না। সরকারি চাকুরিজীবী বাবা বরাবরই ছেলেকে নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তবুও বারবার ব্যর্থতার হতাশা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চাপ যতীনের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
পরীক্ষার মাত্র দু’দিন আগে তিনি নিজের মোবাইলে একটি ভিডিও বার্তা রেকর্ড করেন। সেখানে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও বারংবার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা তাঁকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। যদিও নিজের মৃত্যুর জন্য তিনি কাউকে দায়ী করেননি। পরদিন সকালে নিজের ঘর থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আগের রাত পর্যন্ত তাঁর আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়নি। পরিবারের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া, ঠাকুরদার সঙ্গে হাসি-মশকরা সবই ছিল স্বাভাবিক।
প্রতিযোগিতার চাপে বাড়ছে মানসিক সংকট (NEET-UG 2026)
যতীনের মৃত্যু আবারও সামনে এনে দিল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মানসিক চাপের কঠিন বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ সীমিত হলেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুল। ফলে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী বছরের পর বছর ধরে একই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হন। নিট বাতিল হওয়ার পর গত দেড় মাসে অন্তত ১০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে এসেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের অনেকেই পরীক্ষার অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির ক্লান্তিতে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মনোবিদদের মতে, শুধুমাত্র পরীক্ষার ফল নয়, ব্যর্থতার সামাজিক চাপ, আত্মীয়-স্বজনের প্রত্যাশা এবং নিজের স্বপ্নপূরণের অদম্য আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় তরুণ-তরুণীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

প্রশ্নফাঁস বিতর্কের পর ফের NEET-UG (NEET-UG 2026)
২০২৬ সালের NEET-UG পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পর অবশেষে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রবিবার অনুষ্ঠিত হতে চলা এই পরীক্ষায় অংশ নেবে প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী। ফলে পরীক্ষাটিকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষার সময় (NEET-UG 2026)
পুনঃপরীক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল সময়সীমা বৃদ্ধি। আগে যেখানে পরীক্ষার সময় ছিল ৩ ঘণ্টা, সেখানে এবার পরীক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ১৫ মিনিট সময় পাবেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরু হবে দুপুর ২টায়। পরীক্ষা শেষ হবে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে। মোট সময়সীমা হবে ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট বা ১৯৫ মিনিট। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত সময় পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন বিশ্লেষণ এবং উত্তর লেখার ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
টেলিগ্রামের উপর নিষেধাজ্ঞা (NEET-UG 2026)
পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের নাম উঠে এসেছিল। সেই কারণে পরীক্ষা চলাকালীন নির্দিষ্ট এলাকায় টেলিগ্রাম ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন
যতীন কুমারের মৃত্যু শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এক বড় প্রশ্নও তুলে ধরেছে। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিতে স্বচ্ছতা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি পরীক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া। শুধু প্রশ্নফাঁস রোধ বা নিরাপত্তা জোরদার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কাউন্সেলিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, পরীক্ষার চাপ সামলানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ সত্য হিসেবে না দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা।



