Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কার্তিক মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথি, অর্থাৎ কালীপুজোর আগের রাত এই দিনটিকেই বলা হয় ‘ভূত চতুর্দশী’ (Bhoot Chaturdashi )। শাস্ত্র মতে এই রাতে নাকি মর্ত্যলোকে ঘুরে বেড়ান নানা রকম অতৃপ্ত আত্মা, প্রেত ও অশরীরী সত্তা। তাই বাংলার ঘরে ঘরে এই রাতে জ্বালানো হয় চোদ্দ প্রদীপ ১৪ পূর্বপুরুষের আত্মাকে শান্তি দেওয়ার প্রতীক হিসেবে। তবে লোকবিশ্বাস বলে, এই আলোয় তাড়িয়ে রাখা হয় অশুভ ছায়া ও অতৃপ্ত আত্মাদের।
ভয় আর কৌতূহলের মিশেল (Bhoot Chaturdashi )
বাঙালি সংস্কৃতিতে ভূতের অস্তিত্ব কেবল ভয় নয়, বরং তা এক রকম লোকবিশ্বাস, মনস্তাত্ত্বিক ছায়া ও সামাজিক প্রতিফলন। শহুরে জীবনেও আজও ‘নিশির ডাক’, ‘শাকচুন্নির ছায়া’ বা ‘বেলগাছের ব্রহ্মদৈত্য’ গল্পে, সিনেমায়, কিংবা চায়ের আড্ডায় জায়গা করে নেয় অনায়াসে।
অতৃপ্তা নারীর ছায়া (Bhoot Chaturdashi )
যেসব নারী অবিবাহিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তাঁদের আত্মা নাকি পেত্নি রূপে মর্ত্যে ফিরে আসে। এই আত্মারা জলা জায়গা, পুরনো বট বা শ্যাওড়া গাছে বাসা বাঁধে বলে বিশ্বাস। তাদের অস্তিত্বের মধ্যে থাকে অতৃপ্ত প্রেম, ঈর্ষা, কিংবা প্রতিশোধের আগুন। রাতের দিকে একলা পথে সাদা শাড়ি পরা এক নারীকে দেখা গেলে অনেকে আজও বলেন “ও পেত্নি!”
অমর বিবাহিতার আত্মা (Bhoot Chaturdashi )
‘শাকচুন্নি’ শব্দটি এসেছে ‘শাঁখা-পলা’ থেকে। বিবাহিত নারীরা মৃত্যুর পরও যদি সংসারের প্রতি আসক্ত থাকেন, তাহলে তাঁরা শাকচুন্নি হয়ে ওঠেন বলে জনবিশ্বাস। হাতে শাঁখা-পলা, কপালে সিঁদূর, আর চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি এমন রূপে অন্ধকারে দেখা মেলে এদের। শাকচুন্নি নাকি সাধারণত বিবাহিত নারীদের শরীরে ভর করে তাঁদের জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
অপঘাতে মৃত ব্রাহ্মণের আত্মা (Bhoot Chaturdashi )
বাঙালি ব্রাহ্মণরা যদি অপঘাতে মৃত্যুবরণ করেন, তাঁরা ব্রহ্মদৈত্য হয়ে ওঠেন। এই ভূতেরা নাকি খালি গায়ে, সাদা ধুতি ও পৈতে পরে বেলগাছের নিচে অবস্থান করে। মৃদু হাসি, হাওয়ার সঙ্গে হালকা গন্ধ, বা মাথায় হঠাৎ ভারী অনুভব এ সবই ব্রহ্মদৈত্যের উপস্থিতির ইঙ্গিত বলে মনে করা হয়। এদের চরিত্র কখনও সদয়, আবার কখনও রুদ্র নির্ভর করে মৃত্যুর কারণ ও অপমানের উপর।
মুসলমান আত্মার প্রেতরূপ (Bhoot Chaturdashi )
‘মামদো’ শব্দটি এসেছে ‘মহম্মদ’ থেকে। মুসলমানদের অপঘাতে মৃত্যু হলে তাঁদের আত্মা নাকি মামদো ভূত হয়ে ফেরে।
যখন কেউ বলে “জিন ভর করেছে”, তখন অনেক সময় সেটি মামদো ভূতের প্রভাব বলেই ধরা হয়। এই ধারণা ইসলামি ও বাঙালি লোকবিশ্বাসের মিশ্রণ, যেখানে জিন ও মামদো একই অদৃশ্য শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।
মাছপ্রেমী বাঙালির আত্মা (Bhoot Chaturdashi )
‘মেছোভূত’ একেবারে খাঁটি বাঙালি উদ্ভাবন। যেসব মানুষ জীবিত অবস্থায় মাছ ছাড়া খেতে পারতেন না, মৃত্যুর পরও তাঁদের আত্মা সেই লোভ ত্যাগ করতে পারে না। ফলে, পুকুরের ধারে, ঘাটে বা মাছবাজারের কাছে রাতে ঘুরে বেড়ায় এই মেছোভূতেরা। রাত বা ভরদুপুরে কেউ যদি মাছ কিনে একলা ফেরেন, নাকি ঘাড়ে চেপে বসতে পারে এই আত্মা।
অপঘাতে মৃত আত্মার প্রতিশোধ (Bhoot Chaturdashi )
যারা ট্রেন, বাস বা দুর্ঘটনায় মুণ্ডচ্ছেদ হয়ে মারা যায়, তাদের আত্মা হয় স্কন্ধকাটা। এই ভূতের বৈশিষ্ট্য মাথাহীন দেহ, যা নিজের হারানো মুণ্ড খুঁজে বেড়ায় রাতের পর রাত। বাংলা লোককথায় এই স্কন্ধকাটার আর্তনাদ নাকি শোনা যায় গভীর রাতে রেললাইনের পাশে।
রাতের আহ্বান (Bhoot Chaturdashi )
ভূতের জগতে সবচেয়ে ভয়ানক ও রহস্যময় সত্তা নিশি। রাতের গভীরে কারও কণ্ঠে যদি নিজের নাম শোনা যায় তবে সেটি নিশির ডাক হতে পারে। নিশি মানুষকে তাদের নাম ধরে ডাকে, আর যদি কেউ সেই ডাকে সাড়া দেয়, সে টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারে যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। লোকবিশ্বাস বলে, নিশি কখনও দু’বারের বেশি ডাকতে পারে না, তাই নিজের নাম তিনবার না শুনে সাড়া দেওয়া উচিত নয়।
আরও পড়ুন: Kali Puja: কালীপুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কুমোরটুলি, টানা বৃষ্টিতে চিন্তায় মৃৎশিল্পীরা
আলোয় তাড়ানো অন্ধকার (Bhoot Chaturdashi )
ভূত চতুর্দশীর রাতে প্রতিটি ঘরে চোদ্দটি প্রদীপ জ্বালানো হয়, যাতে পূর্বপুরুষদের আত্মা আশীর্বাদ করেন, আর অশুভ আত্মারা দূরে থাকে। প্রতিটি প্রদীপ একটি আত্মার প্রতীক মায়ের দিকের সাতজন ও বাবার দিকের সাতজন পূর্বপুরুষ। এই আলোয় মিশে থাকে বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও প্রাচীন বাংলার মানবতাবোধ।



