Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ফাল্গুনের পূর্ণিমা ঘনিয়ে এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন নিজেই রঙের উৎসবের আহ্বান জানায় (Bosonto Utsav)। শিমুল-পলাশের দাউদাউ লাল, কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিময় আভা, কোকিলের সুরেলা ডাক আর মৃদুমন্দ বসন্তের হাওয়া সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অপার্থিব আবহ। এই প্রাকৃতিক উচ্ছ্বাসের মধ্যেই আসে দোল পূর্ণিমা, যা ভারতের নানা প্রান্তে ‘হোলি’ নামে পরিচিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে ‘দোল যাত্রা’ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পায়। নিম্নে দোল পূর্ণিমার ইতিহাস, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হল।

দোল পূর্ণিমার ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Bosonto Utsav)
বাংলায় দোল পূর্ণিমার বিশেষ মর্যাদার অন্যতম কারণ চৈতন্য মহাপ্রভু-র আবির্ভাব তিথি। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমাতেই নদিয়ার নবদ্বীপ-এ তাঁর জন্ম। পঞ্চদশ শতকে তিনি বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে রাধা-কৃষ্ণ প্রেমভক্তির যে ধারা প্রচার করেন, তা বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা ছিল ভক্তি, প্রেম ও মানবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি জাতপাত ও ভেদাভেদ ভুলে ঈশ্বরপ্রেমে সকলকে একসূত্রে বাঁধার আহ্বান জানান। তাঁর নামসংকীর্তন আন্দোলন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভক্তির এক নবজাগরণ সৃষ্টি করে। তাই দোল পূর্ণিমা কেবল একটি রঙের উৎসব নয়, এটি তাঁর আবির্ভাব-স্মরণে আধ্যাত্মিক সাধনার দিনও বটে। নবদ্বীপ ও মায়াপুর-সহ বিভিন্ন বৈষ্ণব তীর্থস্থানে এদিন বিশেষ কীর্তন, ধর্মসভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার রঙ (Bosonto Utsav)
দোল বা হোলির উৎস আরও প্রাচীন এবং পৌরাণিক কাহিনিতে সমৃদ্ধ। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধা-র প্রেমলীলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রঙ খেলার সূচনা। কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ রূপ ও রাধার গৌরবর্ণ নিয়ে কিশোরসুলভ অভিমান এবং ভালোবাসার প্রকাশ থেকেই আবির মেখে রাধাকে রাঙিয়ে দেওয়ার কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত। এই প্রেমলীলাই পরবর্তীকালে সামাজিক রূপ নেয়। ভক্তদের কাছে এটি ঈশ্বরপ্রেমের প্রতীক, আর সাধারণ মানুষের কাছে আনন্দ ও মিলনের উৎসব। বাংলায় প্রথম দিনটি অধিক ধর্মীয় আচারনির্ভর হলেও পরের দিন রঙ খেলার আনন্দ-উল্লাস বেশি লক্ষ্য করা যায়।

‘দোল’ নামের ব্যাখ্যা (Bosonto Utsav)
‘দোল’ শব্দের অর্থ দোলনা বা ঝুলন। দোল পূর্ণিমার দিনে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে ফুল, মালা ও আবির দিয়ে সাজানো দোলনায় বসিয়ে শোভাযাত্রা বের করার প্রথা বহু প্রাচীন। ভক্তরা কীর্তন গাইতে গাইতে সেই দোলনা দুলিয়ে এগিয়ে যান। শঙ্খধ্বনি, করতাল, মৃদঙ্গের তালে তালে এই শোভাযাত্রা এক সমবেত ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। পথের ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ আবির ছড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান। কোথাও পালকি, কোথাও ছোট রথেও বিগ্রহ বহনের প্রথা রয়েছে।
গৃহাচার ও সত্যনারায়ণ পূজা (Bosonto Utsav)
পশ্চিমবঙ্গের বহু ঘরে দোল পূর্ণিমার দিন সত্যনারায়ণ পূজার আয়োজন করা হয়। পরিবারের মঙ্গল, শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনায় এই পূজা পালিত হয়। নারায়ণকে শ্রীকৃষ্ণের অবতাররূপে মানা হয় বলেই এই দিনে তাঁর আরাধনার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ এবং আবির অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় সামাজিক আনন্দপর্ব। অনেকে প্রথমে বিগ্রহে রঙ অর্পণ করে পরে পরস্পরের সঙ্গে রঙ খেলায় অংশ নেন।
বসন্ত উৎসবের সাংস্কৃতিক রূপ (Bosonto Utsav)
দোল পূর্ণিমা ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর উদ্যোগে শান্তিনিকেতন-এ প্রবর্তিত বসন্ত উৎসব দোলকে এক নান্দনিক ও সৃজনশীল মাত্রা দিয়েছে। এদিন ছাত্রছাত্রীরা হলুদ বা গেরুয়া পোশাকে নৃত্য, গীত ও আবৃত্তির মাধ্যমে বসন্তকে আহ্বান জানান। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে, আবিরের মৃদু রঙে এবং সৌহার্দ্যের আবহে এই আয়োজন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সমাদৃত। বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনেও বসন্ত উৎসবের আয়োজন হয়।
আরও পড়ুন: Sikandar Raza: রোহিতকে টপকে রাজাই ‘সিকান্দার’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোল পূর্ণিমা ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে এক সামাজিক মিলনোৎসবে পরিণত হয়েছে। রঙ এখানে শুধু আবির নয়; এটি সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার প্রতীক। এই উৎসব মানুষে মানুষে দূরত্ব কমায়, ভুল বোঝাবুঝি মুছে দেয় এবং নতুন করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। আজকের দিনে দোল মানে কেবল রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার স্মরণ বা চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলনের ঐতিহ্য নয় এটি সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবিকতার আহ্বান। প্রতিবেশী, বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে রঙে রাঙিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার দিন।



