Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতের ঘরের মাটিতে এসে বারবার হুঙ্কার এবং তাঁদের সমর্থকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারির বদলা ভারত নিলো তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের খেতাব জিতে (T20 World Cup)। নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে দাপটের সাথে জয় নিজেদের নামে করলেন সূর্যকুমার যাদবরা। বলা যায় সেমিফানালে ব্রুকের মতো টসে জিতে ফিল্ডিং নিয়ে নিজের পায়েই কুড়োল মারলেন নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক। ৯৬ রানের এই বড় জয়ের মধ্যে প্রতিটা প্লেয়ারের অবদান লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি (T20 World Cup)
কথায় আছে ‘history repeats itself’, আজ আহমেদাবাদ ২০২৪ সালের সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী থাকলো। সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত এক জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার সংলাপ হয়ত সবার মনে থাকবে ‘Ghayal Hoon Isiliye Ghaatak Hoon’। ভারতের ঘরের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতকে যদি চোখ রাঙিয়ে যায় কেউ তবে ভারত তাঁর জবাব দেবে এবং দেবে চোখে চোখ রেখে (T20 World Cup)। ম্যাচের আগে নিউ জিল্যান্ড অধিনায়কের সেই হুঁশিয়ারিই কি আজ পেপ টকের কাজ করে দিয়ে গেল?
সঞ্জু, সূর্যের মায়েদের মতোই জশপ্রীত বুমরার জীবনেও তাঁর মা দলজিৎই সব। আর সেই মায়ের আজ ইচ্ছে ছেলের হাতে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ দেখার। আর মায়ের ইচ্ছে পূরণ করলো তাঁদের ছেলেরা। নতুন করে রূপকথা লেখা হলো স্টেডিয়ামে। ভারতীয় প্লেয়াররা আজ যেন শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক। আজ কেউ তাঁদের বলে দেয়নি কীভাবে কি করবেন তাঁরা। আজ শুধু তাঁদের কাছে বিপক্ষ আর ৪০ ওভার। তাঁর জন্য যা যা করতে হয় সব করতে প্রস্তুত ভারতীয় ব্রিগেড। অন্যদিকে দর্শকাসনে তিন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। আর তাদের সামনেই ভারত নিজেদের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের খেতাব নিজেদের নামে করে নিলো। যা রেকর্ড শুধু তাই নয় এই প্রথম ঘরের মাটিতে কোনও দল টি-২০ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতলো।
ভারতের বোলারদের বারবার আঘাত করেছেন বিপক্ষের ব্যাটাররা একমাত্র বুমরাকে বাদ দিয়ে কারণ আধুনিক ক্রিকেট তাঁকে আক্রমণ করার ক্ষমতা কোনও ব্যাটসম্যানের নেই এটা বিশ্ব বন্দিত। এর জন্য অন্য দেশের প্লেয়াররা কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছেন ভারতীয় বোলারদের আর আজ এই ময়দানে ছিল সব কিছুর জবাব দেওয়ার দিন। তাঁরা আজ শুধু কামব্যাক করলেন তাই নয় ইতিহাসে নিজেদের নাম লেখালেন। ভারত কেন ব্যাট, বল এবং বুদ্ধিতে ক্রিকেটে সেরা তারই নিদর্শন রাখলেন এই মাঠে। ভারত যে হুঙ্কার না দিয়ে নিজেদের কাজ চুপচাপ করে যায় সেটাও শেখ উচিত ভারতের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের আমিরদের মতো প্লেয়ারদের। আর ভারত রক্তাক্ত হলে প্রত্যাঘাত করতে জানে ক্রিকেট ময়দানে।
আহমেদাবাদের স্টেডিয়ামে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে টসে জিতে প্রথম ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন মিচেল স্যান্টনার। ব্যাট হাতে তখন দুই মহারথী প্রস্তুত নিউ জিল্যান্ডকে তাঁদের যোগ্য জবাব দিতে। যদিও সেই সময় সমর্থকদের বুকে একটা চাপা টেনশন কাজ করছে। একদিকে প্রথমবার ঘরের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের খেতাব জেতার হাতছানি তেমন আবার অন্যদিকে তৃতীয়বার বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার লড়াই (T20 World Cup)।
প্রথম দুই ওভার যেন নিউ জিল্যান্ডের বোলারদের কিছুটা বুঝে নেওয়ার সময় নিলেন দুই ওপেনার। এরপর কিছুটা স্থির হয়ে নিজেদের রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন অভিষেক শর্মা এবং সঞ্জু স্যামসন। আজ নারী দিবসের দিনে এই তারকার পিছন থেকে সাপোর্ট করে যাওয়া সেই সকল নারীদের জন্যই যেন আজ মরণপণ লড়াইয়ে সঞ্জু, ঈশানরা।
প্রথম চার ওভারে ৫০ রান ভারতের স্কোর বোর্ডে। ভারত হলো প্রথম দল যারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমি ফাইনাল ও ফাইনালে দ্রুততম এই রান করল। অভিষেক তখন টপ গিয়ারে, একের পর এক বল তখন ছুঁয়ে আসছে বাউন্ডারি লাইন। সঞ্জু আর অভিষেক বলের ঠিকানায় লিখে দিচ্ছে টু দ্য প্যাভিলিয়ান। যে অভিষেকের ফর্মে ফেরা নিয়ে ছিল হাজারও জল্পনা সেই অভিষেক আজ বুঝিয়ে দিলেন কেন আজও তাঁর উপর দলের ভরসা রয়েছে। ৭.১ ওভার, রাচিন রবীন্দ্রর বলে বাইরের বল মারতে গিয়ে শেইফার্টের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ড্রেসিং রুমে। ২১ বলে ৫২ রানের ইনিংসে রয়েছে ৬টি চার এবং ৩টি ছয় (T20 World Cup)।
অভিষেক আউট হওয়ার পর নিউ জিল্যান্ড কিছুটা স্বস্তি পেলেও সেই স্বস্তি স্থায়ী হলো না কারণ একদিকে তখন তখন সঞ্জু ঝড়ে কাঁপছে ব্ল্যাক ক্যাপ শিবির। সুপার এইট, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে পরপর নিজের হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন সঞ্জু। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই নিজের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার প্রমাণ রাখলেন এই ডান হাতি ব্যাটার।
একের পর এক বল বাউন্ডারি লাইন পার করছেন আর ভারতীয় সমর্থকদের চিৎকার তখন ডেসিবেল ছাড়িয়ে আকাশে গর্জন করছে। সেই গর্জনে তখন কান পাতা দায়। জিমি নিশামের বলে আউট সঞ্জু যখন ফিরছেন তখন তাঁর রান ৪৬ বলে ৮৯ রান। ১৫ ওভারে ভারত ২০০ প্লাস রান যোগ করে ফেলেছে স্কোর বোর্ডে (T20 World Cup)। আরেকটু ধরে খেললে হয়তো আজ সেঞ্চুরি হাঁকাতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে নিঃস্বার্থ এক ক্রিকেটার। তাঁর কাছে আগে দল। পরে ব্যক্তি।

আরও পড়ুন: IND vs NZ: সঞ্জু-অভিষেক-ঈশানের দাপটে ‘খামোশ’ স্যান্টনার
তবে তখনও ক্রিজে রয়েছেন ঈশান কিষাণ। বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগেও যে তিনি বিশ্বকাপ খেলবেন সেটা ঠিক ছিল না কিন্তু তিনি যখন ফিরলেন, ফিরলেন রাজার মতো। প্রথম থেকেই ভয়কে জয় করেই মাঠে নেমেছেন যেন। তাঁর ব্যাট যেন তাঁর আজ্ঞাধীন। চার চয়ের বন্যা বইছে তাঁর ব্যাট থেকে। নিজের হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ভারতের বড় রানে রাখলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ২৩ বলে হাফ সেঞ্চুরি করলেন ঈশান তবে জিমির বলে ২৫ বলে ৫২ করে ফিরলেন তিনি। এই মাঠেও ব্যর্থ সূর্যকুমার যাদব।

এক সময় যখন মনে হচ্ছিল সহজেই ভারতের রান ২৭০-এর কাছাকাছি যাবে সেই সময় সঞ্জু এবং ঈশান আউট হয়ে যাওয়ায় রানের গতি কমে যায়। যদিও তাঁরা তাঁদের কাজ করে দিয়েই গিয়েছিল বাকি কাজ ছিল সূর্যকুমার, হার্দিকের উপর। কিন্তু দুই জনই ব্যর্থ হয়ে ফিরলেন। কিন্তু তখনও দুবে তাঁর রূপ ধারণ করেনি। যদিও সেই সময় ২৫০ রান যাবে কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। কিন্তু ব্যাটিংয়ে যখনই সুযোগ পেয়েছেন নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
শেষবেলায় ঝড় তুললেন দুবে। বলা যায় আজ ভারতের শো স্টপার শিবম। ৮ বলে ২৬ করে ভারতের স্কোর বোর্ডে তখন ২৫৫। এর সাথে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সবথেকে বেশিবার ২৫০ প্লাস রান করার রেকর্ড ভারতের দখলে (T20 World Cup)।
পাহাড় প্রমাণ রানের টার্গেট নিয়ে ব্যাট করতে নিউ জিল্যান্ড ব্যাটাররা প্রথম থেকেই টালমাটাল। ভারতীয় বোলাররাও আজ মুখিয়ে ছিলেন কামব্যাক করতে। যে অ্যালেন সেমিফাইনালের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন তাকেই ফেরালেন অক্ষর প্যাটেল। ৭ বলে ৯ রান করে তাঁকে ফিরতে হলো ড্রেসিং রুমে।

এরপর সূর্য দলের সবথেকে ভরসার বোলার এবং ভারতের সেরা অস্ত্র বুমরার কাছে যান। যে বুমরা কোনও দিন নিরাশ করেন না দলকে এবং দলের সমর্থকদের। আবারও বিপক্ষের দুর্গে বুমরার আঘাত আর চূর্ণ নিউ জিল্যান্ডের অহংকার রাচিন রবীন্দ্র। ২ বলে করলেন ১ রান এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার (T20 World Cup)।
এরপর আবার অক্ষর আবার উইকেট। বাপু আজ নিউ জিল্যান্ডের ব্যাটারদের জন্য সত্যিই হানিকারক প্রমাণিত হলেন। ফেরালেন গ্লেন ফিলিপসকে। ৫ বলে ৫ রান করে ফেরেন তিনি। অক্ষরের বলের লেংথ বুঝতে না পেরে বোল্ড হয়ে ফিরলেন তিনি।

এরপর খেলার হাল ধরার চেষ্টা করেন টিম শেইফার্ট। কঠিন সময়ে টানলেন দলকে। অবশেষে হাফ সেঞ্চুরি করে বরুণ চক্রবর্তীর বলে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ আউট হয়ে ফিরতে হয় তাকে। বাউন্ডারি লাইনের কাছে দাঁড়িয়ে দক্ষতার সাথে তাঁর ক্যাচ ধরতে কোনও ভুল করেননি ঈশান। ব্যাটিং এবং ফিল্ডিং, দুই ক্ষেত্রেই নিজেকে উজাড় করে দিলেন ঈশান। ততক্ষণে নিউ জিল্যান্ড অনেকটাই ব্যাক ফুটে (T20 World Cup)।

জিমিকে ফিরিয়ে আবার ধাক্কা দিলেন বুমরা। বুমরা যে বিপক্ষের কাছে এক ত্রাসের নাম সেটা আজ আবার বিশ্বকাপের এই মহামঞ্চে প্রমাণিত হলো। বুমরা মানেই যে এক অতিমানবীয় স্পেল সেটা আর কে না জানে। যদি কক্ষপথ কোনও গ্রহ ভুলে যায় তবুও বুমরা যেন ভুল করতে পারেন না। পরপর দুই স্লোয়ার আর বোল্ড নিউ জিল্যান্ডের দুই ব্যাটার। একটুর জন্য হ্যাটট্রিক মিস করলেন তিনি কিন্তু তাতে কী? তিনি সেই সম্রাট যিনি আসেন শাসন করেন যুদ্ধ জয় করেন আবার চলে যান নিজের প্রাসাদে (T20 World Cup)।
আধুনিক ক্রিকেটে বোলারদের ব্রাডম্যান বুমরা। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে কেন তিনি বিশ্বের সেরা বলার তার প্রমাণ লেখা থাকবে এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। মাত্র ১৫ রান দিয়ে নিলেন চার উইকেট। বুমরার স্পেলেই নিউ জিল্যান্ডের কফিনে শেষ পেরেক পড়লো। ইন সুইং, আউট সুইং, স্লোয়ার আরও কত যে অস্ত্র রয়েছে তাঁর হাতে সেটা শুধু তিনি নিজেই জানেন। আর এই সব মিলিয়েই বুমরা বিশ্বসেরা বা Greatest of All Time।
একসাথে একাধিক রেকর্ড নিজেদের নামে করলো ভারত। একদিকে যেমন ঘরের মাটিতে প্রথম কোনও দল হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড নিজেদের নামে করলো ভারত তেমনই তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড গড়লো গম্ভীর বাহিনী (T20 World Cup)। ভারত প্রমাণ করলো হিস্ট্রি রিপিটও হয় আবার হিস্ট্রি ডিফিটও হয়।


