Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আজকের জাঁকজমকপূর্ণ শারদীয়া দুর্গাপুজোর অনেক আগেই প্রচলিত ছিল এক প্রাচীন রীতি বাসন্তী পুজো (Basanti Puja)। বসন্তের শেষ আর গ্রীষ্মের সূচনালগ্নে অনুষ্ঠিত এই পুজো শুধু দেবী আরাধনা নয়, বরং বাঙালির ঐতিহাসিক স্মৃতি, রোগ-ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই এবং সামাজিক বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আদি দুর্গাপুজোর রূপ (Basanti Puja)
পুরাণ ও ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, বাসন্তী পুজোকেই বাঙালির প্রকৃত দুর্গাপুজো হিসেবে গণ্য করা হয়। মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে এই পুজোর বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। এই পুজোর মূল কেন্দ্রবিন্দু দেবী দুর্গার আদ্যাশক্তি রূপ যিনি সৃষ্টি, পালন ও সংহারের নিয়ন্ত্রক। বসন্তকালীন নবরাত্রি উপলক্ষে দেবীর আরাধনা করা হতো, যা পরবর্তীকালে ‘বাসন্তী পুজো’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
বৈশ্য সমাধির আখ্যান (Basanti Puja)
পুরাণ মতে, রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য-এর কাহিনি বাসন্তী পুজোর মূল ভিত্তি। রাজ্যচ্যুত হয়ে বনবাসে গিয়ে সুরথের সঙ্গে পরিচয় হয় সমাধি নামে এক বৈশ্যের, যিনি নিজ পরিবার কর্তৃক বিতাড়িত। দু’জনেই মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আশ্রয় নেন মেধস মুনি-র আশ্রমে। মেধস মুনির উপদেশে তারা দেবী দুর্গার আরাধনায় ব্রতী হন। দীর্ঘ তপস্যার পর দেবী প্রসন্ন হয়ে তাদের বর প্রদান করেন রাজা সুরথ ফিরে পান তার রাজ্য, আর সমাধি লাভ করেন আত্মজ্ঞান। এই ঘটনাই বাসন্তী পুজোর সূচনার মূল প্রেরণা।
এক সামাজিক প্রেক্ষাপট (Basanti Puja)
এক সময় বাংলায় বসন্ত (smallpox) রোগের প্রকোপ ছিল ভয়াবহ। আধুনিক চিকিৎসা বা টিকার অভাবে মানুষ দেবীর আশ্রয়ই ছিল একমাত্র ভরসা। বসন্ত রোগ-এর প্রাদুর্ভাব প্রশমিত করার আশায় দেবী বাসন্তীর আরাধনা করা হতো। ফলে এই পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক মানসিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।
জমিদারবাড়ি থেকে বারোয়ারি (Basanti Puja)
প্রথমদিকে বাসন্তী পুজো সীমাবদ্ধ ছিল জমিদার, নায়েব ও উচ্চবিত্ত ‘বাবু’ সমাজের মধ্যে। ধন-সম্পদ ও সামাজিক প্রতিপত্তির প্রতীক হিসেবেও এই পুজো গুরুত্ব পেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পারিবারিক পুজো গণ্ডি পেরিয়ে আজ বারোয়ারি বা সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বাসন্তী পুজো আজ আরও প্রাণবন্ত ও গণমুখী।
অকালবোধন ও শারদীয়ার উত্থান (Basanti Puja)
রামচন্দ্র রাবণবধের পূর্বে শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। এই ঘটনাই পরবর্তীকালে শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা করে এবং ধীরে ধীরে আশ্বিন মাসের পুজোই প্রধান উৎসব হয়ে ওঠে। তবে বাসন্তী পুজো তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কখনও হারায়নি।
আরও পড়ুন: Meteorit Explosion: উড়ন্ত অবস্থাতেই বিস্ফোরণ, উল্কার বিস্ফোরণে তোলপাড় আকাশ!
রাজপুর লেবুতলায় মৌলিক বাড়ির পুজো
দেশভাগের সময় ফরিদপুর থেকে আগত মৌলিক পরিবার তাদের ৩০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে এসে বসবাস শুরু করেন রাজপুর লেবুতলা-তে। এই বাড়ির বাসন্তী পুজোর বিশেষ আকর্ষণ, প্রতিমার অনন্য বিন্যাস (পূর্ববঙ্গীয় ধারা), কলাবউয়ের ভিন্ন অবস্থান, মাছের ভোগ (বিশেষ করে বড় বোয়াল মাছ), বিজয়ার দিনে পান্তা ভাত ও পুঁটি মাছ, এবার প্রতিমা নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন সনাতন রুদ্র পাল পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিল্পী।
বর্তমানে দেবমাল্য মৌলিকের নেতৃত্বে এই পুজো পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহৎ সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখানে উপস্থিত থাকেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা যেমন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কৌশিক গাঙ্গুলী, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।



