Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: হাসি মানেই আনন্দ এই সরল সমীকরণকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে এক চরিত্র জোকার (Frightening Clowns)। আপাতদৃষ্টিতে রংচঙে মুখ, বড় লাল নাক, অতিরঞ্জিত হাসি ও অদ্ভুত পোশাকে যে বিদূষক আমাদের হাসানোর কথা, সেই জোকারই বহু শতাব্দী ধরে ভয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওটিটি মঞ্চে মুক্তি পাওয়া হরর সিরিজ ‘ইট: ওয়েলকাম টু ডেরি’ আবারও সেই চিরন্তন আতঙ্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। স্টিফেন কিং-এর বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘ইট’-এর প্রিকুয়েল এই সিরিজে ‘দ্য ডান্সিং ক্লাউন’ পেনিওয়াইজ ফের প্রমাণ করেছে জোকার কখনওই নিছক হাস্যরসের বাহক নয়।

জোকার কি আদৌ ভালো? (Frightening Clowns)
গবেষক ও লেখক বেঞ্জামিন র্যাডফোর্ড তাঁর বই ‘Bad Clowns’-এ এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন, “জোকাররা কখন দুষ্ট হয়ে ওঠে, এই প্রশ্নটাই ভুল। কারণ ওরা কখনওই ভালো ছিল না।” এই বক্তব্যের ভিতরেই লুকিয়ে আছে জোকার-ভয়ের মূল দর্শন। র্যাডফোর্ডের মতে, জোকাররা আদতে trickster ধূর্ত, প্রতারক, নিয়মভাঙা এক সত্তা। আর এখানেই তাদের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় শয়তানের। বাইবেলের শয়তানও এক চরম ধূর্ত সত্তা যে মুখোশ পরে, রূপ বদলায়, বিভ্রান্ত করে। অতিরঞ্জিত হাসি ও মুখোশের আড়ালে থাকা এই অস্বাভাবিকতা মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি করে।
ইউরোপীয় থিয়েটারে ভয়ের বীজ (Frightening Clowns)
আধুনিক জোকারদের পূর্বপুরুষ হিসেবে প্রথমেই যার কথা আসে, সে হল হার্লেকুইন। ষোড়শ শতকে ইতালির কমেদিয়া দেল আর্তে থিয়েটারের জনপ্রিয় চরিত্র এই হার্লেকুইন ছিল নীতিহীন, ধূর্ত ও হাস্যরসাত্মক এক ভৃত্য। রুইতন চিহ্নে ভরা পোশাক ও রংচড়া মুখোশে সে দর্শককে যেমন হাসাত, তেমনই তার আচরণে ছিল এক অস্বস্তিকর নৈতিক শূন্যতা। এই ধারাবাহিকতাতেই অষ্টাদশ শতকে জন্ম নেয় পুতুল চরিত্র ‘পাঞ্চ’। জনপ্রিয় পাপেট শো ‘পাঞ্চ অ্যান্ড জুডি’-তে পাঞ্চ একদিকে কৌতুক করে, অন্যদিকে স্ত্রীকে মারধর করে, এমনকি নিজের সন্তানকেও হত্যা করে। হাসি আর নৃশংসতার এই যুগলবন্দিই জোকারদের ভয়ের এক স্থায়ী ছাঁচ গড়ে দেয়।

মঞ্চে খুনি জোকার (Frightening Clowns)
উনবিংশ শতকে সাহিত্যে ও নাটকে জোকারের অন্ধকার রূপ আরও স্পষ্ট হয়। চার্লস ডিকেন্সের ‘দ্য পিকউইক পেপার্স’-এ দেখা মেলে এক মদ্যপ, বিকৃত চরিত্রের। একই সময়ে ফরাসি ও ইতালীয় অপেরায় খুনি জোকারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯২৪ সালের নির্বাক চলচ্চিত্র ‘He Who Gets Slapped’-এ দেখা যায় এক প্রতিহিংসাপরায়ণ, তিক্ত জোকার যে সমাজের নির্মমতায় ভেঙে পড়েছে। এখানেই জোকার আর নিছক হাস্যরসের চরিত্র থাকে না; সে হয়ে ওঠে মানসিক যন্ত্রণার প্রতীক।
বিশৃঙ্খলার অবতার (Frightening Clowns)
জোকার বললেই আধুনিক দর্শকের মনে প্রথম যে মুখ ভেসে ওঠে, সে ব্যাটম্যান কমিক্সের জোকার। ১৯৪০ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই চরিত্র শুরু থেকেই খলনায়ক বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও মানসিক বিকৃতির জীবন্ত প্রতিরূপ। ‘The Killing Joke’, ‘Arkham Asylum’-এর মতো কমিক্সে ব্যাটম্যান ও জোকারের দ্বন্দ্ব কেবল নায়ক-খলনায়কের লড়াই নয়, বরং নৈতিকতা ও উন্মত্ততার সংঘর্ষ। চলচ্চিত্রে হিথ লেজার ও জোয়াকিন ফিনিক্স এই চরিত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান যেখানে জোকার একাধারে শয়তানি, দার্শনিক ও সমাজের আয়না।
পোগো দ্য ক্লাউন (Frightening Clowns)
বিংশ শতকের সাত ও আটের দশকে জোকার-ভীতিকে আরও ঘনীভূত করে মার্কিন সিরিয়াল কিলার জন ওয়েন গেসি। ‘পোগো দ্য ক্লাউন’ নামে পরিচিত এই খুনি বাস্তবে খুব একটা জোকারের পোশাক না পরলেও, জেলে বসে আঁকা একটি সেলফ-পোর্ট্রেটই তাকে এই নাম দেয়। তার ভয়াবহ অপরাধ জনমানসে জোকারকে চিরতরে আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত করে।
চিরন্তন ভয়ের রূপ (Frightening Clowns)
তবে জোকারকে সর্বজনীন ভয়ের প্রতীকে রূপান্তরিত করার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে স্টিফেন কিং-এর। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘ইট’ উপন্যাসে তিনি পেনিওয়াইজকে সৃষ্টি করেন যে প্রতি ২৭ বছর অন্তর ডেরি শহরে ফিরে এসে শিশুদের শিকার করে। পেনিওয়াইজ আদতে কোনও জোকার নয়; সে এক নামহীন, অবয়বহীন সত্তা, যে ভয়ের রূপ ধারণ করে। টিম কারির অভিনয়ে টেলিমুভি, পরবর্তী চলচ্চিত্রে বিল স্কার্সগার্ডের অনবদ্য অভিনয় এবং এখন ওয়েব সিরিজ সব মিলিয়ে পেনিওয়াইজ আজ আধুনিক হররের এক চিরস্থায়ী আইকন।
আরও পড়ুন: Voter List: খসড়া ভোটার তালিকা সংশোধনে মাইক্রো অবজারভার নিয়োগে সবুজ সংকেত নির্বাচন কমিশনের
হাসির মুখোশ, অন্ধকার মন
জোকারদের ভয় পাওয়ার কারণ আসলে গভীর মনস্তাত্ত্বিক। মুখোশ, রংচঙে মুখ আর সারাক্ষণ হেসে চলার অস্বাভাবিকতা মানুষের মনে অবচেতনে ভয়ের জন্ম দেয়। তারা পরিচিত অথচ অচেনা, হাস্যকর অথচ হিংস্র। আধুনিক সময়ের অনিশ্চয়তা ও নৈতিক ধূসরতার সঙ্গে এই চরিত্র যেন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে।



