Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তের সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র সাগর বাউন্ডুলে, একাকী, ভাবুক ‘মনোফোনে’ প্রেমিকাকে ফোন করে (Japan Wind Phone)। এই ফোনে কোনও তার নেই, সংযোগ নেই, নেই ওপার থেকে আসা বাস্তব কণ্ঠস্বর। তবু সাগর কথা বলে, শোনে, উত্তরও নিজেই তৈরি করে নেয়। আসলে সে কথা বলে নিজের মনের গভীরে জমে থাকা আবেগের সঙ্গে। এই ‘মনোফোন’ নিছক সাহিত্যিক কল্পনা মনে হলেও, বাস্তব জগতে তার এক বিষণ্ণ, গভীর মানবিক প্রতিরূপ আছে জাপানের ‘উইন্ড ফোন’।

শোকের সঙ্গে কথা বলার এক মাধ্যম (Japan Wind Phone)
‘উইন্ড ফোন’ আদতে একটি সংযোগহীন টেলিফোন। কোনও নেটওয়ার্ক নেই, কোনও ডায়াল টোন নেই, তবু মানুষ সেখানে ফোন করে। কাকে? মৃত প্রিয়জনকে। যাঁরা প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন মা, বাবা, জীবনসঙ্গী, সন্তান বা বন্ধু তাঁরা এই ফোনে এসে মনের কথা বলেন। বলেন অপূর্ণ কথা, অনুচ্চারিত ভালোবাসা, জমে থাকা অভিমান কিংবা নিঃশব্দ কান্না। এটি কোনও অলৌকিক যন্ত্র নয়, বরং শোক কাটিয়ে ওঠার এক গভীর মানসিক পথ।
ব্যক্তিগত শোক থেকে সামাজিক আশ্রয় (Japan Wind Phone)
এই উইন্ড ফোনের জন্ম এক ব্যক্তিগত বেদনা থেকে। জাপানের উদ্যান ডিজাইনার ইতারু সাসাকি ২০১০ সালে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ তুতো আত্মীয়কে হারান। ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে মৃত্যু ঘটে তাঁর। মৃত্যুর পর সাসাকি অনুভব করেন কিছু কথা রয়ে গেছে, যা আর কাউকে বলা যায় না। সাধারণ ফোনে তো মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়। এই অসহায়তা থেকেই তাঁর মাথায় আসে এক অদ্ভূত কিন্তু মানবিক ভাবনা যদি এমন একটি ফোন থাকে, যেখানে শুধু মনের কথা বলা যাবে?

ওৎসুচির পাহাড়ে নীরব এক ফোন বুথ (Japan Wind Phone)
প্রথমে সাসাকি নিজের বাড়ির বাগানে একটি উইন্ড ফোন বসান। পরে তিনি জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওৎসুচি শহরের পাহাড়ে একটি নির্জন বাগান তৈরি করেন। পাহাড়ের চূড়ায় বসানো হয় সেই ফোন বুথ। এই স্থানটি ইচ্ছাকৃতভাবেই শহরের কোলাহল থেকে দূরে। সেখান থেকে গোটা শহর দেখা যায়। চারপাশে নিস্তব্ধতা, আর পাহাড়ি অঞ্চলে সারাক্ষণ বইতে থাকা ঝোড়ো হাওয়া।
অলৌকিক অনুভব (Japan Wind Phone)
সাসাকি নিজেই বলেছেন, “সাধারণ ফোনে মনের কথা বলা যায় না। উইন্ড ফোনে তা বলা যায়।” ঝোড়ো হাওয়া ফোনের ভিতর দিয়ে বয়ে গিয়ে তৈরি করে এক অদ্ভূত শব্দতরঙ্গ। সেই শব্দ অনেকের কাছে মনে হয় যেন কোনও অদৃশ্য উপস্থিতির ইশারা। বাস্তবে হয়তো তা কেবল বাতাসের শব্দ, কিন্তু শোকাকুল মানুষের মনে তা হয়ে ওঠে মৃত প্রিয়জনের নীরব উত্তর। এই পরিবেশেই মানুষ কথা বলে, কাঁদে, চুপ করে থাকে। কেউ দীর্ঘক্ষণ রিসিভার কানে ধরে রাখে, কেউ বা শুধু ফোনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে কথা না বলেও।

আরও পড়ুন: Frightening Clowns: রংচঙে হাসির আড়ালে লুকিয়ে শয়তান?
ব্যক্তিগত থেকে সমষ্টিগত শোক
২০১১ সালে ভয়াবহ তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামিতে ওৎসুচি শহর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অসংখ্য মানুষ প্রিয়জনকে হারান। সেই সময় উইন্ড ফোন হয়ে ওঠে এক সমষ্টিগত শোকের আশ্রয়স্থল। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। আজও বহু মানুষ সেখানে যান শুধু একবার কথা বলার জন্য যে কথা আর কোথাও বলা যায় না। প্রচেত গুপ্তের ‘মনোফোন’ আর সাসাকির ‘উইন্ড ফোন’ দু’টিই আসলে মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি। একটি প্রেমের অনুপস্থিতিতে জন্ম নেওয়া কল্পনা, অন্যটি মৃত্যুর শূন্যতা থেকে উঠে আসা বাস্তব উদ্যোগ। দুটোর কেন্দ্রে রয়েছে একটাই সত্য, মানুষ কথা বলতে চায়। না পারলে কষ্ট জমে যায়।



