Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকা এক নায়কের নাম জাস্ট ফন্টাইন (Just Fontaine)।
ধার করা বুটেই বাজিমাত (Just Fontaine)
সমাজের এমন অনেক সময়কাল আসে যখন জরাজীর্ণ এবং গতিহীন হয়ে পরে সামাজিক ব্যবস্থা। সেই সময় জেগে ওঠে এমন এক শক্তি যা ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের বুকে নতুন আলো জ্বালে। পুরাতন তন্ত্র ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলে সেই সেই শক্তি। এই মৌলিক পরিবর্তন বিপ্লব বলেই পরিচিত (Just Fontaine)।
ফ্রান্সেও এমন শক্তির জাগরণ ঘটেছিল ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯ সালের মধ্যে। সেই নবজাগরণ ফরাসি বিপ্লব বলেই পরিচিত। ফরাসি বিপ্লব ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিপ্লব ছিল ফ্রান্সে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি সময়কাল, যা ১৭৮৯ সালের এস্টেটস জেনারেল দিয়ে শুরু হয় এবং ৯ নভেম্বর ১৭৯৯ সালে ১৮ ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থান দিয়ে শেষ। তবে এমন এক বিপ্লব এসেছিল ফুটবল ময়দানেও। যা আজও ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে। তবে এবার সেই গল্পে ফেরা যাক।
আজ থেকে বেশ কয়েক দশক আগের এই ঘটনা। ফ্রান্স ফুটবল খেললেও তাঁদের তখনও স্বপ্ন হয়ত সেই আলোকরেখায় আসেনি। সেই সময় ফুটবলেও এসেছিল নবজাগরণ আর সেটা এসেছিল ২৪ বছরের এক তরুণ ফুটবলরের হাত ধরে বা বলা ভাল বুটের গতিতে। তবে তিনি ককেসিয়ান নন। বরং তাঁকে বলা ভাল ফরাসি বংশোদ্ভূত। বাবা ছিলেন ফরাসি আর তাঁর মা মরক্কোর। কৈশোর থেকেই তাঁর লড়াই শুরু। দারিদ্রতা তাঁর প্রতিদিনের বিপক্ষ।
সেই বিপক্ষের সঙ্গে সঙ্গে লড়াই করতে করতে তিনি ক্লান্ত হননি। বরং আগুনে পুড়ে যেমন লোহা শক্ত হয়, তিনিও তেমনই কঠিন হয়ে উঠছিলেন। তবে দারিদ্রতা তাঁর চেনা শত্রু। এমনকি বিশ্বকাপের অনুশীলন করতে গিয়ে ছিঁড়ে যায় বুট জোড়া। নতুন বুট কেনার সামর্থ ছিল না তখন। সতীর্থদের থেকে ধার করা বুট পরেই কাঁপিয়ে দিলেন বিশ্বকাপের ময়দান। বিশ্বকাপে করেছিলেন ১৩টি গোল। আজও তাঁর রেকর্ড স্পর্শ করা যায়নি। সেই কিংবদন্তীর নাম জাস্ট ফন্টাইন। ফরাসি উচ্চারণে জা ফঁতে। এই ফরাসি তারকা ফুটবলার সর্বকালীন সেরা ‘গোলমেশিন’ হিসাবেই বিবেচিত হন তিনি (Just Fontaine)।
ফন্টাইনের জন্ম মরক্কোর মারাকেচ শহরে ১৯৩৩ সালে। তাঁর ফুটবল কেরিয়ারের শুরুতাও হয়েছিল তাঁর মায়ের দেশেই অর্থাৎ মরক্কোতে। ১৯৫০ সালে তিনি নাম লেখান সে-দেশের ফরাসি ক্লাব ‘ইউএসএম কাসাব্ল্যাঙ্কা’-তে। সেখানে তিনি খেলেছিলেন তিন বছর। সে-সময় মরক্কান ফুটবল লিগে রাজত্ব ফ্রান্সের শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়দের। তাঁদের বেতনও ছিল স্থানীয়দের থেকে অনেক বেশি অর্থাৎ এখান থেকে বর্ণ বিভাজন স্পষ্ট আর সেই কারণেই এই তারকার যোগ রয়েছে ফুটবল ময়দানে নবজাগরণের সঙ্গে। তবে সেই ভিড়েই জায়গা করে নিয়েছিলেন জাস্ট ফন্টাইন। মাত্র ৪৮টি ম্যাচে ৬২টি গোল করে নজর কেড়েছিলেন ফরাসিদের।
সেই সূত্র ধরেই ১৯৫৩ সালে তিনি চলে আসেন ফ্রান্সে। নিজের দক্ষতা এবং যোগ্যতায় সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম ডিভিশন ফরাসি ক্লাব নিস-এ। সেইসঙ্গে ফ্রান্সের জাতীয় দলে খেলার সুযোগও চলে আসে তাঁর কাছে খুব তাড়াতাড়ি। আসলে প্রতিভা আর ধৈর্য যদি থাকে তবে সুযোগ আসতে দেরি হয় না এই কথাটা তাঁর জন্য প্রযোজ্য। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, ফ্রান্সে এসেও অর্থনৈতিক হাল তেমন বদলায়নি তাঁর (Just Fontaine)।
সে যাই হোক, ১৯৫৩ সালে ফ্রান্সের মাটিতে পা রেখেই এক নতুন নজির গড়েছিলেন ফন্টাইন। গোটা বিশ্বকে বার্তা দিয়েছিলেন নতুন এক শক্তির উত্থানের আর সেই উত্থান তখন হচ্ছে উল্কার গতিতে। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা ছিল ১৭ ডিসেম্বর। অভিষেক ম্যাচেই লুক্সেমবার্গের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের জার্সিতে হ্যাটট্রিক, ফুটবল বিশ্ব বুঝে যায় যে এই ছেলে নতুন ইতিহাস লিখতে এসেছে। আর সেটা বুঝতে কোনও সহায়িকা বইয়ের সাহায্য নিতে হয়নি। জাতীয় দলে ফন্টাইনের এই গোলস্পৃহা অক্ষত ছিল তাঁর কেরিয়ারের শেষ পর্যন্ত (Just Fontaine)।
তবে বর্তমান প্লেয়ারদের মত তাঁর কেরিয়ার দীর্ঘ হয়নি আর তার জন্য দায়ী চোট। মাত্র ২৮ বছরেই তুলে রাখতে হয় তাঁর ‘সোনার’ বুট জোড়া। তবে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ তাঁর জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সে-বার ফ্রান্সের শিবিরকে একক দক্ষতাতেই বিশ্বকাপের মঞ্চে সেমি-ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গেছিলেন ফন্টাইন। উল্লেখ্য, সেটাই ছিল ফ্রান্সের প্রথম সেমি-ফাইনাল অভিযান। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ফন্টাইন গোলের ঝড় তুললেও, সেবার ফ্রান্সকে বশ্যতা মানতে বাধ্য হতে হয়েছিল ব্রাজিলের কাছে। ৫-২ গোলে হেরে বিশ্বজয়ের দৌড় থেকে ছিটকে যায় ফ্রান্স।
তবে সেই ম্যাচ থেকেই আবার জন্ম নেয় আরেক তারকার। ফুটবল সম্রাট পেলের। সেই ম্যাচেই ১৭ বছর বয়সি তরুণ তারকা পেলে নিজের দক্ষতা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ফুটবল বিশ্বে তিনি রাজত্ব করতে এসেছেন। আজও একক এবং অদ্বিতীয় সম্রাট পেলে। সে-ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি (Just Fontaine)।
আরও পড়ুন: TMC: বিরোধী দলনেতা পদে ঋতব্রতর নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ, কলকাতা হাইকোর্টে মামলা তৃণমূলের
তবে ব্রাজিল কাপ ঘরে তুললেও বিশ্বরেকর্ডের পাতায় নাম লিখিয়েছিলেন ফরাসি নায়ক ফন্টাইন। দুটি হ্যাটট্রিক-সহ ১৩টি গোলের সেই রেকর্ড অক্ষত আজও (৬ ম্যাচের নিরিখে)। রিসার্ভ বেঞ্চে থাকা আরেকজন প্লেয়ারের জুতোর মাপের সঙ্গে তাঁর পায়ের মাপ মিলে যাওয়ায় তাঁকে নিজের অতিরিক্ত বুট জোড়া ধার দিয়েছিলেন স্তেফান ব্রুয়ে। তবে অন্যের বুটের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে খেলা যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে জাস্ট সেই চ্যালেঞ্জ নিলেন এবং জয় করলেন প্রতিকূলতা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে করা তাঁর ১৩টি গোলের সবকটা গোলই আসে ধার করা বুটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আজকের ফরম্যাটে কোনও ফাইনালিস্ট দলের খেলোয়াড়কে এই রেকর্ড স্পর্শ করতে ধারাবাহিকবাহে ২টি করে গোল করতে হবে প্রতি ম্যাচে।
এই বিশ্বকাপের তিন বছর পরেই ইতি হয় এই মহাকাব্যিক রূপকথার। এর মধ্যেও মাত্র ৭ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ২১ ম্যাচে ৩০টি গোল রয়েছে তাঁর। ক্লাবের জার্সিতে ২৮৩ ম্যাচে করেছেন ২৫৯টি গোল। ফরাসি ক্লাব রিমসকে এনে দিয়েছেন দুটি লিগ ট্রফি, ইউরোপিয়ান ক্লাবের রানার্স-আপ শিরোপা। বিশ্বকাপের আগে এই নায়ককে স্মরণ না করলে ইতিহাস ক্ষুন্ন হবে (Just Fontaine)।


