Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: মহারাষ্ট্রের পুনের লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিং করতে গিয়ে ২৫ বছর বয়সি ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের রহস্যমৃত্যু প্রথমে দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হয়েছিল (Ketan Agarwal Murder Mystery)। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য। পুলিশের দাবি, এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত খুনের ষড়যন্ত্র।
)
সুখের বিয়ের প্রস্তুতি থেকে মৃত্যুর অন্ধকারে (Ketan Agarwal Murder Mystery)
কেতন আগরওয়াল ছিলেন পারিবারিক রিয়েল এস্টেট সংস্থা Success Group-এর ডিরেক্টর এবং চিফ মার্কেটিং অফিসার। চলতি বছরের শুরুতেই তাঁর বাগদান হয়েছিল সিয়া গোয়ালের সঙ্গে। আগামী নভেম্বর মাসে রাজস্থানের উদয়পুরে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের প্রস্তুতিও চলছিল দুই পরিবারের তরফে। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ের সময় খাদে পড়ে মৃত্যু হয় কেতনের। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা যায়।
‘দুর্ঘটনা’র গল্প শুনিয়েছিলেন সিয়া (Ketan Agarwal Murder Mystery)
ঘটনার পর পুলিশকে সিয়া গোয়াল জানান, দুর্গের ধারে ছবি তুলছিলেন তাঁরা। সেই সময় প্রবল হাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে খাদে পড়ে যান কেতন।এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রথমে একটি Accidental Death Report (ADR) দায়ের হয়। উদ্ধারকারী দল প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় কেতনের দেহ উদ্ধার করে। কিন্তু তদন্তকারীদের সন্দেহের সূচনা হয় খুব দ্রুতই।

এক কফি ডেটেই কি তৈরি হয়েছিল খুনের ব্লুপ্রিন্ট?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কেতনের মৃত্যুর ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ১৭ জুন পুনের একটি ক্যাফেতে দেখা করেন সিয়া গোয়াল এবং তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধুরী। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিট নাগাদ দু’জনে ক্যাফেতে প্রবেশ করেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা পরে বেরিয়ে যান। তদন্তকারীদের দাবি, এই বৈঠকেই কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এমনকি লোহাগড় দুর্গের অবস্থান, পথঘাট ও নির্জন অংশ সম্পর্কে জানতে ইউটিউব ভিডিওও ব্যবহার করেছিলেন তাঁরা। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্গের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য খতিয়ে দেখেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল কোথায় এবং কীভাবে অপরাধ সংঘটিত করা হবে।
বয়ানে অসঙ্গতি, সেখান থেকেই শুরু সন্দেহ (Ketan Agarwal Murder Mystery)
তদন্তে প্রথম বড় মোড় আসে যখন সিয়া তাঁর বয়ান পরিবর্তন করেন। প্রথমে তিনি বলেছিলেন, ছবি তুলতে গিয়ে কেতন পড়ে যান। পরে জেরার মুখে জানান, দুর্গে ওঠার পর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তাঁরা। কেতন জল খেতে চেয়েছিলেন এবং বোতল দেওয়ার সময় পা পিছলে খাদে পড়ে যান।একই ঘটনার দুটি ভিন্ন বিবরণ তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
মোবাইলে নেই একটিও ছবি! (Ketan Agarwal Murder Mystery)
সিয়ার দাবি ছিল, দুর্গে দাঁড়িয়ে তাঁরা ছবি তুলছিলেন। কিন্তু কেতনের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে পুলিশ কোনও ছবি খুঁজে পায়নি। এই তথ্য তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ যদি সত্যিই ছবি তোলা হয়ে থাকে, তাহলে মোবাইলে তার কোনও না কোনও প্রমাণ থাকার কথা।পাশাপাশি পুলিশ জানতে পারে, যেখানে কেতন পড়েছিলেন, সেটি সাধারণ পর্যটক বা ট্রেকারদের বিশ্রামের জায়গা নয়। বরং তুলনামূলকভাবে নির্জন এলাকা।

সিসিটিভিতে ধরা পড়ল ‘হুডি পরা রহস্যময় ব্যক্তি’
লোহাগড় দুর্গ এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান। ফুটেজে দেখা যায়, সিয়া ও কেতনের কিছুটা দূরে একজন হুডি পরা ব্যক্তি হাঁটছেন। পুলিশ দাবি করেছে, সিয়া বারবার পিছন ফিরে ওই ব্যক্তির দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং একসময় হাতের ইশারাও করেন। অপর ব্যক্তিকেও সেই ইশারার প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা যায় বলে তদন্তকারীদের দাবি।
মোবাইল লোকেশন ফাঁস করল আসল পরিচয় (Ketan Agarwal Murder Mystery)
সিসিটিভি ফুটেজের পাশাপাশি কল ডিটেল রেকর্ড (CDR), মোবাইল লোকেশন এবং যাতায়াত সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, হুডি পরা ওই ব্যক্তি আর কেউ নন, চেতন চৌধুরী। তদন্তে আরও জানা যায়, কেতন ও সিয়ার আগেই দুর্গে পৌঁছেছিলেন চেতন। সেখানে মাত্র ৪৮ মিনিট অবস্থান করে তিনি চলে যান। পুলিশের মতে, একজন সাধারণ পর্যটক এত কম সময়ের জন্য দুর্গে আসেন না। বরং এটি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে আসার ইঙ্গিত বহন করে।
জেরায় উঠে এল ষড়যন্ত্রের চিত্র (Ketan Agarwal Murder Mystery)
চেতন চৌধুরীকে আটক করে জেরা করার পর তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসে বলে দাবি পুলিশের। যদিও পুলিশের বক্তব্য, শুধুমাত্র স্বীকারোক্তির উপর নির্ভর করা হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল প্রমাণ, মোবাইল লোকেশন, কল রেকর্ড, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে সমস্ত তথ্য। এই সবকিছুর ভিত্তিতেই সিয়া গোয়াল ও চেতন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রেমের সম্পর্কই কি খুনের কারণ?
তদন্তকারীদের অনুমান, সিয়া ও চেতনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেতনের সঙ্গে বাগদান হওয়ার পরও সেই সম্পর্ক বজায় ছিল। পুলিশ খতিয়ে দেখছে, এই সম্পর্কের কারণেই কি কেতনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও আর্থিক বা ব্যক্তিগত কারণও রয়েছে।

তদন্ত এখনও চলছে
বর্তমানে সিয়া গোয়াল ও চেতন চৌধুরী পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তকারীরা এখনও ডিজিটাল ডেটা, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করছেন। যে মৃত্যু প্রথমে দুর্ঘটনা বলে মনে হয়েছিল, তা এখন দেশের অন্যতম আলোচিত অপরাধ মামলায় পরিণত হয়েছে। কফি শপের এক বৈঠক থেকে শুরু করে সিসিটিভির একাধিক ফুটেজ, মোবাইল লোকেশন এবং পরিবর্তিত বয়ান সব মিলিয়ে লোহাগড় দুর্গের খাদে কেতন আগরওয়ালের মৃত্যুর রহস্য যেন ক্রমশ আরও গভীর হয়ে উঠছে।



