Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা সিনেমায় লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ছবির সংখ্যা খুব বেশি নয়। সেই দিক থেকে পরিচালক শীলাদিত্য মৌলিক পরিচালিত (Charak Fair of Faith 2026) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। ছবিটি বাংলার বহু প্রাচীন ধর্মীয় আচার “চরক পূজা” কে কেন্দ্র করে বিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাসের সংঘাতকে সামনে নিয়ে আসে। লোকজ আচার, সামাজিক বাস্তবতা এবং রহস্যঘেরা হত্যাকাণ্ড এই তিনের মিশ্রণে নির্মিত এই সামাজিক থ্রিলার দর্শকদের সামনে এক অস্বস্তিকর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে: বিশ্বাস কোথায় শেষ হয় এবং অন্ধবিশ্বাস কোথা থেকে শুরু হয়?

চরক উৎসবের প্রেক্ষাপটে গল্পের বিন্যাস (Charak Fair of Faith 2026)
চলচ্চিত্রটির মূল প্রেক্ষাপট বাংলার গ্রামীণ সমাজে পালিত চরক উৎসবকে ঘিরে (Charak Fair of Faith 2026)। এই উৎসব হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো বলে মনে করা হয় এবং বাংলার পাশাপাশি বিহার ও অসমের কিছু অঞ্চলেও পালিত হয়। শিব ও কালীকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত এই আচার-অনুষ্ঠানে ভক্তদের কঠোর সাধনা, দেহে লৌহশলাকা বিদ্ধ করা কিংবা আকাশে ঝুলে থাকা, এ ধরনের দৃশ্য বহুদিন ধরেই লোকসংস্কৃতির অংশ।
এই উৎসবের ঠিক আগে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা, একটি ছোট ছেলে, কাণু (অভিনয়ে শৈমল শ্যামল) রহস্যজনকভাবে খুন হয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডই ছবির কেন্দ্রীয় রহস্যে পরিণত হয়। গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত একটি ভয়ংকর কুসংস্কারের কথা এখানে উঠে আসে সন্তানহীন দম্পতিরা যদি কোনও শিশুকে বলি দেয়, তবে নাকি তারা সন্তানের আশীর্বাদ লাভ করতে পারে। এই ধারণা থেকেই গল্পের উত্তেজনা ও ভয়াবহতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবে প্রশ্ন থেকে যায় কাণুর মৃত্যু কি সত্যিই সেই অন্ধবিশ্বাসের ফল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও সত্য লুকিয়ে আছে?
সমান্তরাল গল্পে বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব (Charak Fair of Faith)
ছবিটির অন্যতম শক্তি হল এর সমান্তরাল গল্পের কাঠামো। একদিকে রয়েছে আদিবাসী গ্রামবাসী সুকুমার (অভিনয়ে শশী ভূষণ) ও তার স্ত্রী। বহু বছর ধরে সন্তান না হওয়ায় সুকুমার চরক মেলার প্রধান পুরোহিতের ভূমিকা নেয় এবং কঠোর আচার পালনের মাধ্যমে দেবতাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে রয়েছেন পুলিশ অফিসার সুবাশ শর্মা (অভিনয়ে সহিদুর রহমান) এবং তাঁর স্ত্রী শেফালি (অভিনয়ে অঞ্জলি পাতিল)। তারা শিক্ষিত ও শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলেও দীর্ঘদিন ধরে সন্তান না হওয়ার যন্ত্রণায় ভুগছেন। এমনকি সুবাশের মায়ের চাপে পড়ে তারাও নানা ধরনের ভেষজ ও লোকজ চিকিৎসার আশ্রয় নেন। এই দুই গল্পের মধ্যে দিয়ে ছবিটি দেখাতে চায় শিক্ষা বা আর্থিক অবস্থান যতই উন্নত হোক, বিশ্বাস ও কুসংস্কারের প্রভাব থেকে কেউ পুরোপুরি মুক্ত নয়।

পরিবেশ নির্মাণ (Charak Fair of Faith)
ছবিটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল এর দৃশ্যগ্রহণ। সিনেমাটোগ্রাফার মানস ভট্টাচার্য এবং প্রশান্তনু মহাপাত্র গ্রামীণ প্রকৃতি, পাহাড়ি দৃশ্য এবং চরক মেলার ভয়ংকর অথচ রহস্যময় আবহকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। মেলার দৃশ্যে দেখা যায় তান্ত্রিক ও অঘোরীদের নানা আচার খুলি থেকে জল পান করা, ভয়ংকর সাধনা, শরীরে লৌহশলাকা বিদ্ধ করা কিংবা হুক দিয়ে ঝুলে থাকা। এই দৃশ্যগুলো প্রায় ডকুমেন্টারি ধরনের বাস্তবতা তৈরি করে, যা ছবির রহস্যঘন আবহকে আরও তীব্র করে তোলে।
আবহসঙ্গীতের শক্তি (Charak Fair of Faith)
ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন বিশাখ জ্যোতি। তাঁর তৈরি গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বিশেষ করে “ঘোর অঘোর” এবং “যজ্ঞকুণ্ড” ছবির আবহকে গভীর করে তোলে। লোকসংগীত, শাস্ত্রীয় সুর এবং আচারসংক্রান্ত ধ্বনির মিশ্রণে তৈরি এই সংগীত দর্শকদের এক অদ্ভুত অস্বস্তি ও রহস্যের অনুভূতির মধ্যে নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন: Anuparna Roy: ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব জয়ের পর নতুন কোন গল্প বলবেন অনুপর্ণা
ছবির মূল বক্তব্য
ছবিটির মূল শক্তি এর সামাজিক বার্তায়। এটি দেখায় যে বিশ্বাস মানুষের মানসিক শক্তির উৎস হতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাস যখন যুক্তিহীন কুসংস্কারে পরিণত হয় তখন তা ভয়ংকর বিপদের জন্ম দেয়। গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত কিছু প্রথা এবং মানুষের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ভয়াবহ অপরাধ ঘটতে পারে এই বিষয়টিই ছবিটি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, শিক্ষা ও আধুনিকতার পরেও মানুষের মন থেকে কুসংস্কার পুরোপুরি মুছে যায় না।



