Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতার রিয়েল এস্টেট, পুলিশ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের এক অন্ধকার জগতের ছবি উঠে এল আদালতে (Shantanu Sinha Biswas)। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির দাবি, এটি কোনও সিনেমার গল্প নয়, বরং বাস্তবের এমন এক দুর্নীতির জাল যেখানে পুলিশ অফিসার, প্রোমোটার, কাউন্সিলর এবং স্থানীয় দুষ্কৃতীদের যোগসাজশে চলত জমি দখল, সিন্ডিকেট এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেন। এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের ডিসিপি পদমর্যাদার অফিসার শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। আদালতে দাঁড়িয়ে ইডির আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী কার্যত বিস্ফোরক অভিযোগের ঝাঁপি খুলে দেন। তাঁর বক্তব্য, “গোটা ঘটনা শুনলে মনে হবে গল্প বলছি, কিন্তু এটা গল্প হলেও সত্যি।”

ত্রিমুখী জোটের অভিযোগ (Shantanu Sinha Biswas)
ইডির দাবি অনুযায়ী, এই চক্রের মূল ব্যবসা ছিল জমি ও নির্মাণকেন্দ্রিক। অভিযোগ, প্রোমোটার জয় কামদার কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় জমি ও নির্মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতেন। প্রথমে জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করা হত, কিন্তু পরে কম দামে জমি হাতানোর জন্য শুরু হত চাপ সৃষ্টি। যদি কোনও মালিক নির্দিষ্ট দামে জমি বিক্রি করতে রাজি না হতেন, তবে তাঁকে ভয় দেখানো হত। এই কাজে ব্যবহার করা হত স্থানীয় দুষ্কৃতী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের। আদালতে ইডি জানায়, “সোনা পাপ্পু” নামে পরিচিত এক ব্যক্তি এই ‘এক্সিকিউশন’-এর কাজ করত। অর্থাৎ ভয় দেখানো, চাপ সৃষ্টি, জমি দখলের বাস্তব কাজ তারাই সামলাত। ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, এই গোটা ব্যবস্থার পেছনে ছিল একটি শক্তিশালী ‘নেক্সাস’, যেখানে পুলিশের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘শান্তনুই ছিলেন ছাতা’, ইডির দাবি (Shantanu Sinha Biswas)
আদালতে ইডির অন্যতম বড় দাবি ছিল, শান্তনু সিনহা বিশ্বাস শুধুমাত্র একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন না, বরং গোটা নেটওয়ার্কের ‘প্রটেকশন শিল্ড’ বা ছাতা হিসেবেই কাজ করতেন। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, তিনি নিজের পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন জমি দখল ও নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে সহায়তা করতেন। কলকাতার কালীঘাট, হেয়ার স্ট্রিট, উল্টোডাঙা, রবীন্দ্র সরোবর, ফুলবাগান-সহ একাধিক এলাকায় জমি সংক্রান্ত অভিযোগ উঠে এসেছে। ইডি আদালতে জানায়, পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করানো হত। এর ফলে প্রকৃত মালিকেরা চাপে পড়তেন এবং শেষ পর্যন্ত জমি ছাড়তে বাধ্য হতেন।

নিয়মিত যোগাযোগের অভিযোগ (Shantanu Sinha Biswas)
তদন্তে উদ্ধার হওয়া ডায়েরি, ডিজিটাল তথ্য ও চ্যাটের ভিত্তিতে ইডির দাবি, জয় কামদার নিয়মিত পুলিশকর্তাদের উপহার পাঠাতেন। শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর প্রতিদিন যোগাযোগ ছিল বলেও দাবি করা হয়। ইডির অভিযোগ অনুযায়ী, শান্তনুকে একটি অত্যন্ত দামি ঘড়ি উপহার দেওয়া হয়েছিল যার মূল্য এক কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও তাঁর পরিবারকেও নিয়মিত আর্থিক সুবিধা দেওয়া হত বলে দাবি তদন্তকারীদের। তদন্তে উঠে এসেছে বলেও দাবি করা হয় যে, তাঁর ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে বহু লেনদেন হয়েছে। শুধু একটি ক্ষেত্রেই ২১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা ট্রান্সফারের উল্লেখ করেছে ইডি। আরও কয়েক লক্ষ টাকার একাধিক লেনদেনের তথ্যও আদালতে তুলে ধরা হয়।
মেডিক্যাল কলেজের ক্যান্টিন থেকে কোটি টাকার আয়?
ইডির অভিযোগ অনুযায়ী, শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের স্ত্রী পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজে ক্যান্টিন ব্যবসা চালাতেন। সেই ব্যবসা থেকেই কোটি কোটি টাকার আর্থিক প্রবাহ হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। এছাড়াও তাঁর ছেলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক কোটিরও বেশি টাকা তুলেছেন বলেও আদালতে জানানো হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই সমস্ত আর্থিক লেনদেনের উৎস ও প্রকৃতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ওসিদের বদলি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ (Shantanu Sinha Biswas)
শুধু জমি বা সিন্ডিকেট নয়, কলকাতা পুলিশের অভ্যন্তরীণ বদলি প্রক্রিয়াতেও শান্তনুর প্রভাব ছিল বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইডির বক্তব্য, কলকাতা পুলিশ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি বিভিন্ন থানার ওসিদের বদলি ও পোস্টিংয়ে প্রভাব খাটাতেন। এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, পুলিশ কমিশনার বদলির তালিকা প্রকাশ করার পর তা প্রত্যাহার করিয়ে নিজের পছন্দমতো তালিকা কার্যকর করাতেন। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন তাঁকে কলকাতা থেকে জেলায় বদলির নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শান্তনুর আইনজীবীর পাল্টা যুক্তি (Shantanu Sinha Biswas)
অন্যদিকে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের আইনজীবী শাবির আহমেদ আদালতে দাবি করেন, শুধুমাত্র কোনও উচ্চপদে থাকা মানেই অপরাধী প্রমাণ করা যায় না। তিনি বলেন, “এখানে কোনও নেক্সাস নেই। তদন্তকারীরা দু’বার বাড়িতে এসেছেন। সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে গিয়েছেন। আমার মক্কেল তদন্তে সহযোগিতা করেছেন।” তাঁর দাবি, যে টাকার লেনদেনের কথা বলা হচ্ছে তা দুটি সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তির জন্য হয়েছিল এবং পরে সেই চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। শান্তনুর পরিবারকে অযথা হেনস্তা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, স্ত্রী ব্যবসা করতেই পারেন, ছেলে চাকরি করতেই পারে—সেটা অপরাধ নয়।
কেন ১৪ দিনের হেফাজত চাইল ইডি? (Shantanu Sinha Biswas)
ইডির যুক্তি, এই মামলায় বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এখনও বহু ব্যক্তি তদন্তের আওতার বাইরে। বিশেষ করে “সোনা পাপ্পু” এখনও অধরা। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, শান্তনু সিনহা বিশ্বাস বাইরে থাকলে তিনি প্রভাব খাটিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে পারেন, অন্য পুলিশ অফিসারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন এবং তদন্তে বাধা দিতে পারেন। এই কারণেই তাঁকে ১৪ দিনের ইডি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: NEET Re exam Date: বাতিল নিটের নতুন তারিখ ঘোষণা হল
সিন্ডিকেট রাজ’-এর নতুন অধ্যায়?
এই মামলাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ইডির বক্তব্য সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হবে না, বরং কলকাতার রিয়েল এস্টেট, পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এক গভীর ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর পর্দাফাঁস হিসেবেও দেখা হবে। এখন নজর আদালতের পরবর্তী শুনানি ও তদন্তের অগ্রগতির দিকে। কারণ এই মামলার প্রতিটি নতুন তথ্য আরও বড় বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।



