Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ত্রয়ণ চক্রবর্তী: বিধানসভায় স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেট নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয় তুলে ধরেন (Suvendu Adhikari)। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৩ বছর ধরে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেট নিয়ে কার্যত কোনও বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। এমনকি এই দফতর সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর পর্বও অনুষ্ঠিত হতো না। তাঁর মতে, স্বরাষ্ট্র দফতর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হওয়ায় এর কাজকর্ম নিয়ে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক আলোচনা হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী দফতরকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি এবং সেই প্রক্রিয়াই বর্তমান সরকার শুরু করেছে।
পুলিশ প্রশাসনকে দুর্বল করার অভিযোগ (Suvendu Adhikari)
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, পূর্ববর্তী সরকার সচেতনভাবেই পুলিশ প্রশাসনকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, স্থায়ী নিয়োগ না করে বছরের পর বছর অস্থায়ী কর্মী বা সিভিক ভলান্টিয়ারদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থায়ী কর্মীরা আইন ও নিয়ম মেনে কাজ করেন, কিন্তু অস্থায়ী কর্মীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো সহজ। এই কারণেই দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং তোলাবাজির সংস্কৃতি প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এর ফলে গোটা ব্যবস্থাই অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল।
অপরাধ দমনে ‘অপেক্ষা নয়, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা’ নীতি
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নিজের সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, কোনও অপরাধ ঘটলে প্রশাসনকে অপেক্ষা না করে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বারুইপুরের একটি ঘটনার উল্লেখ করে দাবি করেন, সেখানে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি ‘অভয়া’ ঘটনাতেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, অতীতে নন্দীগ্রাম বা গড়বেতার মতো বহু ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বর্তমান সরকার সেই সংস্কৃতি বদলাতে চায় বলে তিনি দাবি করেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা (Suvendu Adhikari)
দুর্নীতির প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী কড়া অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস নয়, অতীতে সিপিআই(এম)-এর আমলেও বিভিন্ন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্নীতির অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করা হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বেআইনি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও প্রয়োজনে নিলাম করা হবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি নিয়ে পাল্টা জবাব
বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসন ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যদি সরকার সত্যিই কোনও কর্মসূচি বন্ধ করতে চাইত, তাহলে তা কোনওভাবেই আয়োজন করা সম্ভব হতো না। তিনি কটাক্ষ করে বিরোধী নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে বলেন, নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতেই এই ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
বিরোধী নেতৃত্বকে তীব্র আক্রমণ (Suvendu Adhikari)
বক্তব্যের এক পর্যায়ে শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী শিবিরের এক শীর্ষ নেতাকে উদ্দেশ্য করে একাধিক কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, “এই ভাইপোর নাম-নিশান পশ্চিমবঙ্গে থাকবে না।” এছাড়াও তিনি বলেন, ডায়মন্ড হারবার থেকেই বিরোধী নেতৃত্বকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়েই সরকার এগোচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আক্রমণের সুরও স্পষ্ট ছিল। তিনি দাবি করেন, রাজ্যের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আর ফিরিয়ে আনতে চান না।

পুলিশে ২০ হাজার নিয়োগের ঘোষণা (Suvendu Adhikari)
পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে বড় ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, রাজ্যে প্রায় ২০ হাজার পুলিশ কর্মী নিয়োগ করা হবে।তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে শূন্যপদ পূরণ না হওয়ায় পুলিশ প্রশাসনের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন নিয়োগের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ আরও কার্যকর হবে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ উদ্যোগ (Suvendu Adhikari)
বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, রাজ্যে নতুন সাইবার সেল চালু হয়েছে। ডিজিটাল প্রতারণা রোধে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ট্রাফিক পুলিশের দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যদি কোনও ট্রাফিক কর্মী ঘুষ গ্রহণ করেন, তাহলে তার তথ্য ভবানী ভবনে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। অর্থাৎ প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেন।
কয়লা ও বালি মাফিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “নো কয়লা, নো বালি।” অর্থাৎ অবৈধ কয়লা ও বালি পাচারের বিরুদ্ধে সরকার সম্পূর্ণ আপসহীন থাকবে। তিনি জানান, উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ কোস্টাল টিম গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, যাঁরা ভারতের নাগরিক নন, শুধুমাত্র তাঁদের ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।

২০১৮ সালের রাজনৈতিক হিংসার নতুন তদন্তের আশ্বাস
রাজ্যের রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া বহু ঘটনার যথাযথ তদন্ত হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বহু বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। শতাধিক মহিলার শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একাধিক মামলা চাপা পড়ে গেছে। তিনি বিধানসভায় ঘোষণা করেন, এই সমস্ত অভিযোগের নতুন করে তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: July21 Mamata: রাতভর ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে পাহারায় ছিল মমতা-অভিষেক!
আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন
বক্তব্যের শেষদিকে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট বার্তা দেন যে, রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, আইন ভাঙলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “আইন ভাঙলে আপনিও আইনের ঊর্ধ্বে নন।” একইসঙ্গে বিরোধী নেতাদের উদ্দেশে তিনি দাবি করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁদের ভবিষ্যৎ নেই এবং রাজ্যের মানুষ নতুন প্রশাসনের উপরই আস্থা রেখেছেন।



