Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনাতেই প্রশাসনের উদ্দেশে স্পষ্ট এবং কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari)। নবান্নে প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আমলাদের সামনে তিনি যে ভাষায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন, তা রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, “আমাকে খুশি করার জন্য নয়, সত্যি কথা বলুন।” দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে যে ‘তোষামোদ’-এর অভিযোগ বারবার উঠেছে, সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব পরিস্থিতি জানাতে তিনি আমলাদের সরাসরি আহ্বান জানান।

‘সমস্যা থাকলে সরাসরি বলুন’ (Suvendu Adhikari)
বৈঠকের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “প্রথম দিনই স্পষ্ট করে বলছি, কিছু বলার থাকলে আমাকে সরাসরি বলবেন। কোনও পরামর্শ থাকলে নির্ভয়ে দেবেন। আমি শুনব। কারও কোনও সমস্যা হলে আমাকে বলবেন। ইতস্তত করবেন না।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনের মধ্যে এক নতুন কর্মসংস্কৃতির ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলের মত। সাধারণত মুখ্যমন্ত্রী ও প্রশাসনের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যে দূরত্ব তৈরি হয়, সেটি কমিয়ে এনে সরাসরি যোগাযোগের পরিবেশ গড়ে তুলতেই এই বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তাঁর আরেকটি মন্তব্য, “আমাকে খুশি করতে কথায় কথায় ‘মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা’ শব্দটি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনের মধ্যে ‘ব্যক্তিপূজা’ বা অতিরিক্ত আনুগত্যের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
‘ভুল দেখলে না বলা উচিত ছিল’ (Suvendu Adhikari)
শুধু ভবিষ্যতের বার্তাই নয়, অতীত প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও আমলাদের সামনে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “গত ১৫ বছরে আপনাদের কিছু ভুল ছিল। কখনও কখনও অন্যায় দেখলে ‘না’ বলা উচিত ছিল।” এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে বিরোধীরা অভিযোগ তুললেও, প্রশাসনের একাংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, প্রশাসনিক স্তরের দায়ও খতিয়ে দেখতে চান।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান (Suvendu Adhikari)
‘যারা বেআইনি সার্টিফিকেট দিয়েছে, কাউকে ছাড়ব না’ বৈঠকের সবচেয়ে কঠোর অংশ ছিল দুর্নীতির প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, গত ১৫ বছরে প্রশাসনিক স্তরে যে দুর্নীতি হয়েছে, তার বিচার হবেই। বিশেষ করে এসআইআর পর্বে বেআইনিভাবে কাস্ট সার্টিফিকেট বা জাতি শংসাপত্র ইস্যুর অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন তিনি। তাঁর কথায়, “যারা বেআইনিভাবে কাস্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করেছেন, তাঁদের আমি ছাড়ব না।”
এছাড়াও চাকরি দুর্নীতি নিয়েও তিনি প্রশাসনের একাংশকে নিশানায় আনেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “চাকরি দুর্নীতিতে যাঁরা সব জেনেও চুপ থেকে সাহায্য করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই এখন নজরে থাকবেন।” এই বক্তব্যের পর প্রশাসনিক মহলে চাপ আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
নতুন মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব বণ্টন (Suvendu Adhikari)
অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বার্তার মিশেল, নতুন সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো সাজানোর কাজও শুরু করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক ভারসাম্যের পাশাপাশি সাংগঠনিক গুরুত্বও স্পষ্ট।
প্রবীণ বিজেপি নেতা Dilip Ghosh-কে দেওয়া হয়েছে গ্রামোন্নয়ন দফতরের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন সংগঠনের দায়িত্ব সামলানো দিলীপ ঘোষকে এই দফতর দেওয়ার মধ্যে গ্রামীণ সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে Agnimitra Paul-কে নারী কল্যাণ ও পুর-নগরোন্নয়ন— এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার পাশাপাশি শহুরে উন্নয়নেও নতুন গতি আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বনগাঁ উত্তরের বিধায়ক Ashok Kirtania পেয়েছেন খাদ্য দফতরের দায়িত্ব। সীমান্তবর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধিকে খাদ্য দফতরের দায়িত্ব দেওয়াও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
একইভাবে Nisith Pramanik-কে দেওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন ও যুব কল্যাণ দফতর। উত্তরবঙ্গে বিজেপির সংগঠন মজবুত করতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
আর বাঁকুড়ার রানিবাঁধের বিধায়ক Khudiram Tudu পেয়েছেন জনজাতি উন্নয়ন দফতরের দায়িত্ব। জঙ্গলমহল ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Diganta Bagchi: আর্টিস্টস ফোরামে ভাঙনের ইঙ্গিত? হঠাৎ ইস্তফা দিগন্তর!
প্রশাসনে কি তবে বদলের হাওয়া?
নবান্নে প্রথম বৈঠক থেকেই শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চান। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল কঠোরতা, তেমনই ছিল স্বচ্ছতা ও সরাসরি যোগাযোগের বার্তা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আমলাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ইঙ্গিত এবং ‘তোষামোদ নয়, সত্যি কথা বলুন’, এই বার্তাগুলি আগামী দিনে রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।



