Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতীয় নাট্যজগতের ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, তাঁদের অন্যতম বিজয়া মেহতা (Vijaya Mehta)। নাট্যপরিচালক, অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ, প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অনন্য। মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ৯১ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। দীর্ঘদিন ধরেই বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণ শুধু মারাঠি নাট্যমঞ্চ নয়, সমগ্র ভারতীয় নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মারাঠি নাট্যআন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ (Vijaya Mehta)
১৯৬০-এর দশকে মহারাষ্ট্রে যখন আধুনিক নাট্যচর্চার নতুন ঢেউ উঠছে, তখন সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন বিজয়া মেহতা। তাঁর নেতৃত্ব, শিল্পদৃষ্টি এবং সাহসী পরীক্ষানিরীক্ষা মারাঠি থিয়েটারকে নতুন পরিচিতি এনে দেয়। তিনি ছিলেন বিখ্যাত নাট্যদল ‘রঙ্গায়ন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই নাট্যদল কেবল নাটক মঞ্চস্থ করত না, বরং সমাজ, রাজনীতি, মানবিক সম্পর্ক এবং আধুনিক জীবনের নানা সংকটকে নাটকের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরত। বিজয়া মেহতা বিশ্বাস করতেন, নাটক শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজকে প্রশ্ন করার, মানুষকে ভাবানোর এবং পরিবর্তনের শক্তিশালী অস্ত্র।
কিংবদন্তিদের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক যাত্রা (Vijaya Mehta)
মারাঠি নাট্যজগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা হয়েছিল বিজয়া মেহতা, বিজয় তেণ্ডুলকর, অরবিন্দ দেশপাণ্ডে এবং ড. শ্রীরাম লাগুর মতো কিংবদন্তিদের হাত ধরে। বিজয় তেণ্ডুলকরের যুগান্তকারী নাটকগুলিকে নতুনভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করে বিজয়া নাট্যজগতে বিপ্লব ঘটান। তাঁর নির্দেশনায় নাটক হয়ে ওঠে আরও বাস্তবধর্মী, সংলাপনির্ভর এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় সমৃদ্ধ। ভারতীয় নাট্যচর্চার আধুনিকীকরণে তাঁর অবদান আজও নাট্যশিক্ষার্থীদের কাছে গবেষণার বিষয়।
মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র, সমান দক্ষতায় সাফল্য (Vijaya Mehta)
শুধু নাট্যমঞ্চেই নয়, চলচ্চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিজয়া মেহতা রেখে গিয়েছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৮৬ সালে পরিচালিত ‘রাও সাহেব’ এবং ১৯৮৮ সালের ‘পেস্টনজি’ ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজও মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দুই ছবিতে তিনি সমাজ, ব্যক্তি, সম্পর্ক এবং সময়ের জটিলতাকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছিলেন। বাণিজ্যিক ছবির বাইরে থেকেও এই চলচ্চিত্রগুলি সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলেও ভারতীয় সিনেমার মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

অভিনেত্রী হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ (Vijaya Mehta)
পরিচালকের পাশাপাশি অভিনেত্রী হিসেবেও বিজয়া মেহতা ছিলেন সমান দক্ষ। ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বহুচর্চিত চলচ্চিত্র ‘পার্টি’-তে তাঁর অভিনয় আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষত্ব ছিল চরিত্রের অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর আবেগের মাধ্যমে প্রকাশ করা। সংলাপের চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গি, শরীরী ভাষা এবং নীরবতার ব্যবহারেই তিনি চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন।
শিল্পচর্চায় পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস (Vijaya Mehta)
বিজয়া মেহতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর নিরন্তর অনুসন্ধিৎসা। তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতি এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক থিয়েটার ভাবনাকে একত্রিত করে নতুন ধরনের মঞ্চভাষা নির্মাণ করেছিলেন। মঞ্চসজ্জা, আলো, সংগীত, অভিনেতাদের চলাফেরা, প্রতিটি বিষয়েই তিনি নতুনত্ব আনতেন। তাঁর পরিচালিত নাটক দর্শকদের কাছে শুধু নাটক নয়, একটি সম্পূর্ণ নান্দনিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠত।
নাট্যশিক্ষক ও সংস্কৃতিচিন্তক হিসেবে অনন্য ভূমিকা
বিজয়া মেহতা কেবল নাটক পরিচালনা করেই থেমে থাকেননি। তাঁর কাছে নাটক ছিল এক আজীবনের সাধনা। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা, নির্দেশক ও নাট্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে তিনি সবসময় আগ্রহী ছিলেন। বহু শিল্পী তাঁর কাছ থেকে অভিনয়ের সূক্ষ্মতা, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং নাট্যনির্মাণের কৌশল শিখেছেন। তাঁর লেখা, বক্তৃতা এবং কর্মশালাগুলি আজও নাট্যচর্চার মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর শোকবার্তা (Vijaya Mehta)
বিজয়া মেহতার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। তিনি বলেন,“মঞ্চ ও চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট মুখ এবং মারাঠি নাট্যমঞ্চের প্রবীণ প্রযোজক ও পরিচালক বিজয়া মেহতার প্রয়াণের দুঃখজনক সংবাদ সত্যিই হৃদয়বিদারক। তাঁর অসামান্য শিল্পসাধনা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।” এই শোকবার্তাই প্রমাণ করে, বিজয়া মেহতার অবদান কেবল শিল্পমহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ।
অনুপম খেরের আবেগঘন স্মৃতিচারণ (Vijaya Mehta)
প্রবীণ অভিনেতা অনুপম খের, যিনি বিজয়া মেহতার পরিচালনায় ‘রাও সাহেব’ এবং ‘পেস্টনজি’-তে অভিনয় করেছিলেন, তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনুপম খের বলেন,“‘রাও সাহেব’ এবং ‘পেস্টনজি’ সিনেমায় বিজয়ার সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ততদিনে আমি কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করে ফেলেছি। ভাবতাম অভিনয় সম্পর্কে কিছুটা বুঝি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে প্রতিটি মহড়া আমাকে মনে করিয়ে দিত যে, অভিনয়ের এই শিল্প আসলে কত বিশাল মহাসাগর।”
ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় নাম
বিজয়া মেহতার জীবন ছিল শিল্প, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি একনিষ্ঠ সাধনার প্রতিচ্ছবি। তিনি দেখিয়েছেন, ভালো নাটক কিংবা ভালো সিনেমা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়; সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখানোর জন্যও প্রয়োজন। আজ তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও, তাঁর নির্মিত নাটক, চলচ্চিত্র, নাট্যভাবনা এবং শিল্পদর্শন আগামী বহু প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখাবে।



