Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: ১৬০৮ সালে বাদশাহ জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে ‘রায়চৌধুরী’ উপাধি লাভ করেন সাবর্ণ পরিবারের ২২তম পুরুষ লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় (Sabarna Roy Choudhury)। এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতিই পরিবারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে অন্য স্তরে পৌঁছে দেয়। তার দুই বছর পর, ১৬১০ সালে, জমিদার লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী ভগবতী দেবীর ইচ্ছায় সূচনা হয় পরিবারের দুর্গাপুজোর। ৪১৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এই পুজো চলে আসছে।

দুর্গাপুজোর সূচনা (Sabarna Roy Choudhury)
সাবর্ণ পরিবারের আগে বাংলায় দুর্গা পূজিত হতেন একক চণ্ডীরূপে। দেবীকে কেন্দ্র করে সমাজ ও পরিবারের মিলন ঘটেনি। কিন্তু সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগেই প্রথমবার দুর্গামূর্তির পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ এবং কার্তিকের প্রতিমা স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, আটচালায় সপরিবার দুর্গার আরাধনার শুরু হয় এ পরিবার থেকেই।

আদি নিবাস থেকে বড়িশা (Sabarna Roy Choudhury)
পরিবারের আদি নিবাস ছিল হালিশহরে। পরে প্রজাদের আনন্দের জন্য ও জমিদারি এলাকার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে বড়িশার বর্ধিষ্ণু অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয় দুর্গাপুজো। সেই থেকে আজও বড়িশা ও আশেপাশের এলাকা সাবর্ণ পরিবারের পুজোর আবহে ভরে ওঠে।

ত্রিধারা সঙ্গম (Sabarna Roy Choudhury)
১৬৬০ সালে বিদ্যাধর রায়চৌধুরীর হাত ধরে পুজোয় যুক্ত হয় এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ‘ত্রিধারা সঙ্গম (Sabarna Roy Choudhury)’। অর্থাৎ, শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব— এই তিন মতের মিলিত ধারা অনুসারে পূজার্চনা শুরু হয়। এখনও পরিবারে দুর্গাপুজো হয় কবি বিদ্যাপতি রচিত ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ গ্রন্থ অনুসারে।

শরিকি আটটি বাড়ির পুজো (Sabarna Roy Choudhury)
বর্তমানে কলকাতা ও তার আশেপাশে সাবর্ণ পরিবারের মোট আটটি শরিকি বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়। এর মধ্যে ছ’টি রয়েছে বড়িশায়—
১. আটচালা বাড়ি
২. বড় বাড়ি
৩. মেজো বাড়ি
৪. মাঝের বাড়ি
৫. বেনাকি বাড়ি
৬. কালীকিঙ্কর ভবন
অন্য দুটি হল—
৭. বিরাটি রায়চৌধুরী বাড়ি
৮. নিমতা-পাঠানপুর বাড়ি
প্রতিটি বাড়িতেই দুর্গাপুজো আলাদা আচার ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিমার বৈশিষ্ট্য ও চালচিত্র
সাবর্ণ পরিবারের প্রতিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মুখমণ্ডল। প্রাচীন রীতি মেনে দেবীর মুখ পানপাতার আকারের। মায়ের গাত্রবর্ণ শিউলি ফুলের বোঁটার মতো হালকা রঙের। গণেশের বর্ণ হয় লাল এবং অসুরের রঙ সবুজ। চালচিত্র তিন ভাগে বিভক্ত থাকে। সেখানে আঁকা হয় দশমহাবিদ্যা যেমন ছিন্নমস্তা, মাতঙ্গী, বগলা, কমলাকামিনী প্রমুখ। পাশাপাশি অবস্থান করেন রাধাকৃষ্ণ, রামচন্দ্র ও মহাদেব। এভাবে শাক্ত-শৈব-বৈষ্ণব মিলনের প্রতিফলন দেখা যায়।

পুজোপদ্ধতি ও বিশেষ রীতি
বোধন : আটচালা বাড়িতে হয় কৃষ্ণা নবমী কল্পে। অন্য বাড়িগুলিতে হয় ষষ্ঠাদি কল্পে।
ভোগ : সাতটি বাড়িতে আমিষ ভোগ হয়, কেবলমাত্র নিমতা-পাঠানপুর বাড়িতে নিরামিষ ভোগের আয়োজন থাকে।
অর্ধরাত্রি বিহিত পুজো : বড় বাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সপ্তমীর রাতে দেবী পূজিতা হন চামুণ্ডারূপে।
মাষভক্তবলি : সাবর্ণ পরিবারের অন্যতম অনন্য রীতি। অষ্টমী ও নবমীতে ১৮০টি মাটির খুরিতে মাষকলাই, ঘি ও দই দিয়ে এই বিশেষ আচার সম্পন্ন হয়। বিশ্বাস করা হয়, অপদেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্যই এই প্রচলন।
কুমারীপুজো : বিরাটি ও বড়িশা বড় বাড়িতে নবমীর দিন কুমারীপুজো অনুষ্ঠিত হয়।

বলি থেকে প্রতীকী বলি
অতীতে এই পরিবারের পুজোয় পশুবলির রীতি প্রচলিত ছিল। ১৩টি ছাগল ও একটি মোষ বলি দেওয়া হত। তবে বহু বছর আগেই পশুবলি বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে আখ ও চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয় প্রতীকী আচার হিসেবে।
দশমীর পর্ব ও বিসর্জন
দশমীর দিনে প্রথমে ঘট বিসর্জন করা হয়। তারপর প্রতিমার সামনে পরিবারের সদস্যরা বিজয়া সম্পন্ন করেন। এর পর বাবুঘাটে প্রতিমার বিসর্জন দেওয়া হয়।
পুজোর সাহিত্যিক ধারা ‘সাবর্ণ বার্তা’
দুর্গাপুজোর আবহে একসময় কলকাতার বহু বনেদি বাড়ি থেকে বিশেষ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতি হারিয়ে গেলেও, সাবর্ণ পরিবারে আজও প্রচলিত। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় প্রতি বছর ‘সাবর্ণ সংগ্রহশালা’-র উদ্যোগে প্রকাশিত হয় পারিবারিক মুখপত্র ‘সাবর্ণ বার্তা’। এর মাধ্যমে পরিবারের সাহিত্যচর্চা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
আরও পড়ুন: Bonedi Barir Durga Puja: কেমন ছিল সেকালের বনেদি বাড়ির দুর্গা প্রতিমা?
আজকের দিনে সাবর্ণ পরিবারের দুর্গাপুজো
বর্তমানের থিমপুজোর যুগেও সাবর্ণ পরিবারের দুর্গাপুজো এক অনন্য অবস্থান ধরে রেখেছে। আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন এই পুজোয় স্পষ্ট। ফলে কলকাতার মানুষ যেমন থিমপুজোয় মেতে ওঠেন, তেমনই বনেদি বাড়ির এই প্রাচীন পূজোর আবহে ইতিহাসের স্পর্শ পান।



