Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার কালীপুজো মানেই ভক্তি, শক্তি আর রহস্যমণ্ডিত ইতিহাসের এক অনন্য সংমিশ্রণ (Bankura Kali Puja2025)। জেলার কালীক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত বাঁকুড়ার প্রাচীন পৌরশহর সোনামুখী সেই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এখানকার অসংখ্য কালীপুজোর মধ্যে অন্যতম হল ‘হট্ নগর কালী’, যা স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি দেবস্থান নয়, বরং বিশ্বাস, অলৌকিক অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহ্যের প্রতীক।
প্রাচীন কালীক্ষেত্র সোনামুখী (Bankura Kali Puja2025)
বাঁকুড়ার সোনামুখী অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে শক্তিপুজোর এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে যেমন বহু শাক্ত মন্দির রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা দেবী-মহিমার অলৌকিক কাহিনি। সারা বছরই নানা মন্দিরে দেবী কালী ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজা চলে, তবে কার্তিক অমাবস্যার তিথিতে অনুষ্ঠিত ‘হট্ নগর কালী’র বাৎসরিক পুজো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময় মন্দির প্রাঙ্গণ আলোয় ঝলমল করে ওঠে, ভক্তদের ঢল নামে দূরদূরান্ত থেকে।
লোককথার সূচনা (Bankura Kali Puja2025)
সোনামুখীর তারিণী সূত্রধর নামে এক বৃদ্ধা ছিলেন এই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে, যখন সোনামুখী ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, তখনই ঘটেছিল এই অলৌকিক ঘটনা। বৃদ্ধা প্রতিদিন বড়জোড়ার নিরশা গ্রামে চিঁড়ে বিক্রি করতে যেতেন, আর বিনিময়ে পাওয়া ধান নিয়ে ফিরতেন পায়ে হেঁটে সোনামুখী। যাওয়া-আসার পথে একটি খালের ধারে তিনি বিশ্রাম নিতেন। সেখানেই একদিন তাঁর দেখা মেলে লাল পাড় শাড়ি পরা এক শ্যামবর্ণ ছোট্ট কন্যার, যে প্রায়ই তাঁকে সঙ্গ দিতে চাইত সোনামুখী পর্যন্ত। বৃদ্ধা প্রতিদিনই মধুরভাবে মেয়েটিকে ফেরাতেন, কিন্তু একদিন কন্যাটি জেদ ধরল “আমি তোমার সঙ্গে যাবই।” অবশেষে নিরুপায় তারিণী সূত্রধর রাজি হলেন।
মানব রূপে মায়ের আগমন (Bankura Kali Puja2025)
পথ চলতে চলতে ছোট্ট মেয়েটি বলল “আমি আর হাঁটতে পারছি না, আমাকে কোলে নাও।” বৃদ্ধা মাথায় ধান ও ঝুড়ি থাকায় বললেন, “এখন কোলের জায়গা নেই।” তখন মেয়েটি হেসে বলল, “আমার ভার তোমার ঝুড়িতেই রাখো।” তারিণী সূত্রধর তাই করলেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে ঝুড়ি নামানোর পর দেখলেন ছোট্ট মেয়েটি নেই, তার বদলে রয়েছে দুটি পাথর! ভয়ে হতবাক বৃদ্ধা সেই পাথরদুটি তুলসীতলায় রেখে দেন। সেই রাতেই তিনি স্বপ্নাদেশ পান, “আমি মা কালী। তোর কষ্ট লাঘব করতে পাথর রূপে এসেছি। তোর আঁকড় গাছের নিচে আমাকে স্থাপন করে পুজো কর।”
স্বপ্নাদেশ, জমিদার ও মন্দির নির্মাণ (Bankura Kali Puja2025)
পরদিন সকালে ভীত-সন্ত্রস্ত তারিণী সূত্রধর লালবাজার এলাকার মানুষদের ঘটনাটি জানান। কিন্তু সে সময় জাতপাত ও বর্ণবৈষম্যের কঠোর সমাজে সূত্রধর পরিবারের পুজো করা ‘অশুচি’ বলে গণ্য হত। তাই পুরোহিত পুজো করতে অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে তিনিও স্বপ্নাদেশ পান, যাতে দেবী নিজেই তাঁকে পুজো করতে নির্দেশ দেন। দেবীর অনুগ্রহে পুরোহিত গুরুতর অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করেন এবং পুজো করতে সম্মত হন। এই সময়ে স্থানীয় জমিদার গিন্নী কাদম্বরী দেবী স্বপ্নে একই নির্দেশ পেয়ে এক খণ্ড জমি দান করেন মন্দির নির্মাণের জন্য এবং পুজো পরিচালনার উদ্দেশ্যে আরও কিছু জমি দান করেন। তখন থেকেই ‘হট্ নগর কালী’র পুজো সোনামুখীর মানুষের নিজস্ব উৎসবে পরিণত হয়।
সূত্রধর পরিবারের ঐতিহ্য (Bankura Kali Puja2025)
আজও প্রাচীন সেই সূত্রধর পরিবারের বংশধরেরাই ঘট আনার অধিকারী। পুরোনো প্রথা মেনে বাৎসরিক পুজোর সময় মন্দিরে থাকা ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট আনা হয়। এই ঘটই দেবীর প্রাণস্বরূপ বলে বিশ্বাস করা হয়। সারা বছর ধরে এই ঘটের নিত্যপূজা, আরতি ও ভোগ চলে মন্দিরে। পুজোর সময় সূর্যাস্তের পর শুরু হয় অলৌকিক আরাধনা ও আগমনী সঙ্গীত, যা স্থানীয় পরিবেশে এক রহস্যময় পবিত্রতার আবহ তৈরি করে।
আরও পড়ুন: Rashmika-Vijay Deverakonda: রশ্মিকার হাতে জ্বলজ্বলে হিরের আংটি, বাগদানে সিলমোহর?
আজকের হট্ নগর কালী মন্দির
বর্তমানে এখানে একটি সুদৃশ্য মন্দির গড়ে উঠেছে। পাকা স্থাপত্যে শোভিত এই মন্দিরে প্রতিদিন ভক্তদের আনাগোনা লেগেই থাকে। কালীপুজোর সময়ে ভোররাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পুজো, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আরতি, হোমযজ্ঞে মুখর থাকে সমগ্র এলাকা। লোকবিশ্বাস অনুসারে, দেবী আজও তারিণী সূত্রধরের বংশকে আশীর্বাদে রক্ষা করেন। ভক্তদের কাছে এই স্থান শুধু পূজার জায়গা নয়, বরং মা কালীর সজীব অলৌকিক উপস্থিতির প্রতীক



