Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: তাঁর জীবনের বর্ণমালায় ম শব্দের অর্থ শুধুই মোহনবাগান (Tutu Bose)।
এক ইতিহাসের অবসান (Tutu Bose)
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে’, আবেগতাড়িত বাঙালির আর কোথাও আশ্রয় না মিললেও বারবার আশ্রয় মেলে যে ঠাকুরের কাছে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিরহ হোক বা মৃত্যু শোক, রবীন্দ্রনাথ যেন সব ক্ষতের ওষুধ। সেই রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের সময়ও এই গানটি গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আজ আবার যখন ময়দান জুড়ে শোকের ছায়া, ময়দান হারিয়েছে তাদের বটবৃক্ষ তখন সেই রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করে নিতেই বাধ্য হতে হচ্ছে (Tutu Bose)।
বাংলা বর্ণমালায় যে সমস্ত শব্দ আছে সেগুলো দিয়ে অনেক শব্দের সৃষ্টি হতে পারে। আমরা সেখান থেকে নানান বিষয় বা বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হই। কিন্তু ম মানে যদি বলি মোহনবাগান শুধুই? বিশ্বাস করতে কিছুটা কষ্ট হবে তাই না? আমার আপনার আরও অনেক শব্দ মাথায় আসলেও ম মানে মোহনবাগান যে সেটা শুধু একজনই বলতে পারতেন। ম-ময় জীবন ছিল যে অধ্যায়ের সেই অধ্যায়ের নাম টুটু বসু। এই এক নামেই তাঁকে সবাই চেনেন। মোহনবাগান দলের অভিভাবক, দলের ত্রাণ কর্তা। যিনি জোর গলায় দলের ছেলেদের বলতে পারেন ‘তোরা মন দিয়ে খেল, ট্রফি জেত, বাকিটা আমি দেখে দেব।’ সেই টুটু বসু আর নেই এটা কলকাতার ময়দান যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

মোহনবাগানের যে সুদীর্ঘ ইতিহাস সেটা সকলের জানা আর এই ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায় জুড়ে রয়েছেন টুটু বসু। যিনি নিছক রসিকতার শুরে বলতেন ‘আমার ম-এর দোষ আছে’। সেই ম তাঁর কাছে মোহনবাগান। তবে এটা রসিকতার মত শুনতে মনে হলেও তিনি মোটেও মজা করতেন না। ক্লাব ছিল তাঁর প্রাণ। আর সেই মহীরুহর প্রয়াণে প্রতিদ্বন্ধিতা ভুলে ভেঙে পড়েছে ইস্টবেঙ্গল সহ সব ক্লাবের সদস্য থেকে প্লেয়াররা। মোহনবাগান তাঁর রক্তে, তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসে, তাঁর হৃদয়ে (Tutu Bose)।
স্বপনসাধন বসু, অর্থাৎ টুটু বসু আবার অনেকের কাছেই টুটুবাবু। তাঁর প্রয়াণে তৈরি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা। মঙ্গলবার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘিদিন ধরে সামলেছেন মোহনবাগান দলের প্রশাসনিক দায়িত্ব। তবে তিনি যে শুধুই প্রশাসক ছিলেন তা নয় ছিলেন দল অন্তপ্রাণ একজন মানুষ। মন্দিরে পুরোহিত ছাড়া যেমন যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয় না তেমন তিনি ছিলেন মোহনবাগানের একজন, যাঁকে ছাড়া মোহনবাগান ভাবাই যায় না।
বুধবার সকালে যখন তাঁর নশ্বর দেহ যখন এসে পৌঁছাল মোহনবাগান তাঁবুতে তখন সেখানে প্রতিটা কোণে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। নিঃশব্দের ভাষা নেই নাকি আছে? যে ভাষা একদমই ভাসা ভাসা নয় বরং তীব্র। তীব্র সেই হাহাকার। আজ যেন এক রাজা ক্লাব তাঁবুতে পা রাখলেন, কোনও অসুস্থতা ছাড়াই। চোখে মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি শেষবার নিজের ক্লাবতাঁবুতে পা রাখলেন মুকুটহীন সম্রাট। কিন্তু বাকিরা তখন থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন কারণ তাঁরা জানেন এই সম্রাট আর আসবেন না এই মাটিতে (Tutu Bose)।
বুধবার তাঁর শেষকৃত্যের আগে শহর জুড়ে থাকবে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর নানা আয়োজন। বুধবার সকালে প্রথমে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বালিগঞ্জের বাসভবনে। সকাল ৮টা ৩০ থেকে ১০টা পর্যন্ত সেখানে দেহ শায়িত ছিলেন তিনি। আত্মীয়-পরিজন, কাছের মানুষ এবং অনুরাগীরা সেখানে এসেছিলেন তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে (Tutu Bose)।
এরপর সকাল ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভবানীপুর ক্লাবে। এই ক্লাবের সঙ্গে বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সঙ্গে। এরপর সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে টুটুবাবুর দেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর প্রাণের ক্লাব মোহনবাগানে। এই ক্লাবেই যে তিন দশকের বেশি সময় তিনি কাটিয়েছেন। সেখানে হাজারো মানুষের চোখের জলে বিদায় নেবেন তিনি। তাঁদের প্রিয় টুটুদাকে দেখতে আসবেন হাজার হাজার মানুষ। সবশেষে বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
ক্লাবে পৌঁছে টুটু বোসকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে প্রয়াত মহাজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মোহনবাগানের সঙ্গে বাঙালিদের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। টুটু বাবু মানেই মোহনবাগান এবং মোহনবাগান মানেই টুটুবাবু। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এবং নিজে আমি ক্লাবে এসেছিলাম তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে। আমার সঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক ছিলেন, ক্লাবকর্তারাও ছিলেন। মোহনবাগান সমর্থক, টুটুবাবুর শুভাকাঙ্খীদের সমবেদনা জানাই। সমর্থকদের কাছে আবেদন, টুটু বাবু যেভাবে দলটাকে আগলে রেখেছিলেন, আপনারাও আগলে রাখুন। তাঁর চলে যাওয়া অনেক বড় ক্ষতি (Tutu Bose)।’
আরও পড়ুন: Purba Medinipur: পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদে ফের রাজনৈতিক উত্তেজনা
দিনের শেষে কালের নিয়মে অস্তমিত হতে হয় সূর্যকে। এমন আভাস কি পাওয়া যায় আগে থেকেই? হয়ত কেউ কেউ পান। কারণে ২৯ জুলাই যখন নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হল মোহনবাগান রত্ন সম্মান তখন শিশুর মত কেঁদে উঠেছিলেন তিনি। বাকরুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘এটা হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে আমি আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি।’ কিছুটা স্মৃতি পিছনে নিলে দেখা যাবে হয়ত তিনি এই দিনটার আগাম আভাস পেয়েছিলেন আর তাই বলেছিলেন, ‘শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে। হয়তো আর তোদের সঙ্গে আমার দেখা হবে না’ (Tutu Bose)।
যেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘এবার ১৯টা লাইফ মেম্বার হয়েছে। আমি চাই ২০টা হোক। আর সেই ২০ নম্বর লাইফ মেম্বার যেন পরজন্মে টুটু বসু হয়।’ এই কথা যেদিন সবাই শুনেছিলেন সেদিনই সবার মন হু হু করেছিল। আবেগতাড়িত কথার মূর্ছনায় মূর্ছিত হয়েছিলেন সকলে। মোহনবাগানের প্রতি তাঁর এই আবেগ, আত্মসমর্পণ যা অমলিন থেকে যাবে ফুটবল প্রিয় বাঙালির হৃদয়ে। এই জন্ম পেরিয়ে পরের জন্মেও তিনি হয়ে থাকলেন মোহনবাগানের লাইফ মেম্বার।
আজ ময়দান শুধু একজন মানুষকে হারায়নি, হারিয়েছে এক আবেগকে, এক ইতিহাসকে, এক দীর্ঘ সময়কে। টুটু বসুর নাম মোহনবাগানের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটা কংক্রিটে, ক্যান্টিনের স্টু পাউরিটিতে, গ্যালারিতে থেকে যাবে। যতবার ম উচ্চারিত হবে কেউ যেন বলে উঠবেন ম মানেই মোহনবাগান। আর দূর থেকে ভেসে আসবে সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের লাইন, ‘মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা, বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে –তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে (Tutu Bose)।’


