Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
প্রতিবেদন ত্রয়ণ চক্রবর্তী: কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গ দিবস কবে? ২০ জুন, ১ বৈশাখ নাকি ১ নভেম্বর? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তী বিজেপির দাবি এবং পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপনের যুক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর মতে, ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা শুধু ঐতিহাসিকভাবে ভুল নয়, বরং ইতিহাসের একটি জটিল অধ্যায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরলীকরণ করার চেষ্টা (Sujan Chakraborty)।

২০ জুন ১৯৪৭: কী ঘটেছিল সেদিন? (Sujan Chakraborty)
সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০ জুন ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় আইনসভায় বাংলা বিভাজন নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছিল। সেই ভোটের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বাংলার একাংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং অন্য অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনও একক ব্যক্তির উদ্যোগে হয়নি। আইনসভার সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতেই বাংলাভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সেই সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, কংগ্রেসের সদস্যরা এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরাও।
আরও পড়ুন : Adhir Ranjan Chowdhury: রেড রোড নিয়ে দ্বিচারিতা? বিস্ফোরক প্রশ্ন অধীর রঞ্জনের
সুজনের বক্তব্যে প্রশ্ন উঠে এসেছে যদি বাংলাভাগের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক ভোটাভুটির মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র একজন নেতাকে সেই সিদ্ধান্তের একমাত্র কৃতিত্ব দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে ঘিরে বিজেপির দাবি নিয়ে প্রশ্ন
বিজেপির একাংশ দাবি করে যে পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষার পিছনে প্রধান ভূমিকা ছিল Syama Prasad Mukherjee-র। তাঁদের মতে, তাঁর উদ্যোগ এবং প্রস্তাবের ফলেই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে টিকে যায়।
কিন্তু সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন (Sujan Chakraborty)
তাঁর মতে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি অবশ্যই সেই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু বাংলাভাগের সিদ্ধান্ত ছিল সম্মিলিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফল। তিনি বলেন, ‘‘একজন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রস্তাবে সবকিছু হয়ে গেল আর বাকি সদস্যরা কি বানের জলে ভেসে এসেছিলেন?’’ সুজনের দাবি, ইতিহাসকে একজন ব্যক্তির কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ করে দেখানো হলে প্রকৃত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়।

‘পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন’ কি সত্যিই ২০ জুন?
সিপিআই(এম) নেতার মতে, ২০ জুন ১৯৪৭ বাংলাভাগের ভোটগ্রহণের দিন হতে পারে, কিন্তু সেটিকে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জন্মদিন বলা যায় না। কারণ আজকের পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক মানচিত্র তখনও সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজ্যের বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে যে একটি ভোটগ্রহণের দিন এবং একটি রাজ্যের চূড়ান্ত গঠন এই দুটিকে এক করে দেখা ইতিহাসের সঙ্গে সুবিচার করে না।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মানচিত্রের ভিত্তি (Sujan Chakraborty)
সুজন চক্রবর্তীর মতে, যদি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভূখণ্ডের গঠনকে কেন্দ্র করে কোনও দিবস পালন করতে হয়, তাহলে ১ নভেম্বর ১৯৫৬-র বিষয়টি বেশি প্রাসঙ্গিক। সেই সময়ে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী বিভিন্ন সীমান্ত ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে রাজ্যের বর্তমান রূপ আরও স্পষ্ট ও স্থায়ী হয়। তাঁর যুক্তি, আজকের পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র ২০ জুন ১৯৪৭-এ তৈরি হয়নি। ফলে ওই দিনকে ‘রাজ্য গঠন দিবস’ বলা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
১ বৈশাখ নিয়েও আপত্তি (Sujan Chakraborty)
সুজন চক্রবর্তী শুধু ২০ জুন নয়, পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের নির্ধারিত ১ বৈশাখকেও পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, ১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষ হিসেবে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক জন্মদিন হিসেবে ওই তারিখেরও কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অর্থাৎ, তাঁর মতে ২০ জুন যেমন ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি ১ বৈশাখকেও পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।
ইতিহাস বনাম রাজনৈতিক ব্যাখ্যা
সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্যের মূল সুর হল ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁর মতে, বাংলাভাগ, স্বাধীনতা এবং পশ্চিমবঙ্গের গঠন ছিল বহু রাজনৈতিক দল, নেতা এবং ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সম্মিলিত ফল। তাই কোনও একটি রাজনৈতিক দল বা একজন নেতার কৃতিত্ব হিসেবে পুরো ঘটনাকে তুলে ধরা ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে সরলীকৃত করে।



