Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: হুগলির তারকেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী শ্রাবণী মেলা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা দেশের শিবভক্তদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাগম (Chandannagar Light)। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী বৈদ্যবাটি নিমাই তীর্থ ঘাট থেকে গঙ্গাজল কাঁধে নিয়ে পদযাত্রা করে পৌঁছান বাবা তারকনাথের মন্দিরে। এই বিপুল জনসমাগমকে আরও আকর্ষণীয় ও নান্দনিক করে তুলতে এবার এক অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলার প্রধান পথ এবং মন্দির চত্বর সাজানো হচ্ছে চন্দননগরের বিশ্ববিখ্যাত আলোকসজ্জায়। এই উদ্যোগ শুধু ধর্মীয় উৎসবকে নতুন মাত্রাই দিচ্ছে না, দীর্ঘদিন ধরে কাজের অভাবে সমস্যায় থাকা চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের কাছেও এটি আশার আলো হয়ে উঠেছে।

চন্দননগরের আলোয় আলোকিত হবে তারকেশ্বর
রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল আগেই ঘোষণা করেছিলেন, এবারের শ্রাবণী মেলায় তারকেশ্বর মন্দির ও সংলগ্ন রাজপথ সাজানো হবে চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকসজ্জায়। সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের কাজ ইতিমধ্যেই জোরকদমে শুরু হয়েছে। বৈদ্যবাটি নিমাই তীর্থ ঘাট থেকে তারকেশ্বর মন্দির পর্যন্ত দীর্ঘ পথজুড়ে বসানো হচ্ছে আধুনিক এলইডি আলোর গেট, আলোকমালায় সজ্জিত গাছ, রঙিন আলোর বোর্ড এবং বিভিন্ন নান্দনিক আলোকনকশা। পুরো পথটি যেন রাতের অন্ধকারে রূপ নেবে এক আলোকময় শিল্পকর্মে।
শিবের বিভিন্ন প্রতীক ফুটে উঠবে আলোর শিল্পে (Chandannagar Light)
চন্দননগরের আলোকশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আলোর মাধ্যমে জীবন্ত শিল্পরূপ তুলে ধরা। এবারের শ্রাবণী মেলাতেও সেই ঐতিহ্য বজায় রাখা হচ্ছে। আলোর গেটগুলিতে ফুটে উঠবে, বাবা তারকনাথের মন্দিরের আদল, মহাদেবের বিশাল প্রতিকৃতি, ত্রিশূল, ডমরু ওঁ প্রতীক, বিভিন্ন পৌরাণিক নকশা, ধর্মীয় ও শৈল্পিক আলোকচিত্র, উন্নতমানের এলইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমনভাবে আলোকসজ্জা করা হচ্ছে যাতে দর্শনার্থীরা এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে পারেন।

কাজে ব্যস্ত চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা
জগদ্ধাত্রী পূজার পর সাধারণত চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা বড় কাজের অপেক্ষায় থাকেন। দুর্গাপূজো আসার আগে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ না থাকায় অনেক শিল্পীকেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়। এবার শ্রাবণী মেলার এই বড় বরাত সেই পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। চন্দননগরের বিভিন্ন কারখানায় এখন দিনরাত চলছে লোহার স্ট্রাকচার তৈরি, এলইডি সংযোজন এবং আলোর গেট নির্মাণের কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে শিল্পী ও কর্মীরা নিরলস পরিশ্রম করছেন।
প্রথমবার এত বড় আর্থিক বরাত (Chandannagar Light)
চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের মতে, তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলার জন্য এবারই প্রথম এত বড় আর্থিক বরাত এসেছে। যদিও সব শিল্পী এই কাজ পাননি, তবুও যাঁরা সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি উদ্যোগে এমন বৃহৎ প্রকল্পে চন্দননগরের আলো ব্যবহৃত হওয়ায় শিল্পীদের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে রাজ্যের আরও বড় অনুষ্ঠানেও এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিল্পীদের বক্তব্য (Chandannagar Light)
চন্দননগরের আলোকশিল্পী মনোজ সাহা জানান, বৈদ্যবাটি নিমাই তীর্থ ঘাট থেকে তারকেশ্বর মন্দির পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে আলোকসজ্জার কাজ চলছে। গাছ, রাস্তার দু’ধার এবং মন্দির চত্বরে বসানো হচ্ছে আধুনিক এলইডি আলোর ব্যবস্থা। বিভিন্ন আলোকগেটে থাকবে মন্দিরের আদল, শিবের মূর্তি এবং ধর্মীয় নকশা। তিনি বলেন, নতুন সরকারের উদ্যোগে প্রথমবার চন্দননগরের আলো দিয়ে শ্রাবণী মেলা সাজানোর সুযোগ পাওয়া গেছে। যদিও কাজটি সরকারি ঠিকাদারের মাধ্যমে হচ্ছে, তবুও এই প্রকল্প চন্দননগরের আলোকশিল্পের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে তিনি আশাবাদী। অন্যদিকে আলোকশিল্পী জয়ন্ত দাস সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বহু বছর ধরে চন্দননগরের আলো দেশ-বিদেশে দুর্গাপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, কালীপূজা এবং নানা উৎসবে ব্যবহৃত হলেও সরকারি বড় প্রকল্পে সরাসরি শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত ছিল।

টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে শিল্পীদের ক্ষোভ (Chandannagar Light)
শ্রাবণী মেলার আলোকসজ্জার কাজ ঘিরে শিল্পীদের একাংশের মধ্যে কিছু অসন্তোষও রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি টেন্ডারের তথ্য অনেক শিল্পীর কাছেই পৌঁছায়নি। ফলে কলকাতার কিছু ঠিকাদার সংস্থা বরাত পেয়ে পরে চন্দননগরের শিল্পীদের সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দিয়েছে। এর ফলে, শিল্পীদের লাভের পরিমাণ কমে যায়। প্রকৃত শিল্পীরা ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হন। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে শিল্পের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। শিল্পীদের দাবি, ভবিষ্যতে যদি চন্দননগর আলো অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সরাসরি কাজ দেওয়া হয়, তাহলে বহু ছোট ও মাঝারি শিল্পী কাজের সুযোগ পাবেন এবং এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও বিকশিত হবে।
মধ্যস্বত্বভোগী নয়, সরাসরি কাজের দাবি (Chandannagar Light)
চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা মনে করেন, তাঁদের বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বড় বড় সরকারি প্রকল্পে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ খুব কম মেলে। তাঁদের বক্তব্য, আলোর প্রকৃত কারিগররাই যদি সরাসরি টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন, তাহলে কাজের মান যেমন আরও উন্নত হবে, তেমনি শিল্পীরাও তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন। এতে চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকশিল্প আরও সুসংগঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
উদ্বোধনে থাকার সম্ভাবনা মুখ্যমন্ত্রীর (Chandannagar Light)
আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলা। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। সেই কারণেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্ত আলোকসজ্জার কাজ শেষ করতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন শিল্পীরা।

আরও পড়ুন: Green Churi: শ্রাবণে সবুজ কাচের চুড়ি পরার রীতি কেন?
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন
চন্দননগরের আলোকসজ্জা বহু দশক ধরেই বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। দুর্গাপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, কালীপূজা থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তের বড় বড় উৎসবে এই আলোর শিল্প বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। এবার সেই বিশ্বমানের শিল্পকর্মে সেজে উঠতে চলেছে তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলা। ধর্মীয় আবেগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকশিল্প—এই তিনের মিলনে এবারের শ্রাবণী মেলা নিঃসন্দেহে দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।



