Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতা পুরসভাকে আরও কার্যকর, জনমুখী এবং প্রশাসনিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলতে বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে (Kolkata)। আসন্ন পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন-এর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডে জনসংখ্যার বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছিল। কোথাও অত্যধিক জনসংখ্যা, কোথাও তুলনামূলকভাবে কম বাসিন্দা, এই অসামঞ্জস্য দূর করতেই এবার ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৪৪ থেকে ২০০ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে শহরের নির্মাণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, শ্রমিকদের সার্টিফিকেশন এবং বহুতল নির্মাণের নিয়মাবলিতেও কড়া অবস্থান নিয়েছে কলকাতা পুরসভা। প্রশাসনের মতে, নাগরিক পরিষেবাকে আরও উন্নত এবং জবাবদিহিমূলক করতেই এই পদক্ষেপগুলি নেওয়া হচ্ছে।
জনসংখ্যার ভারসাম্য আনতেই ওয়ার্ড পুনর্গঠন (Kolkata)
কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, নতুন ডিলিমিটেশনের মূল উদ্দেশ্য প্রতিটি ওয়ার্ডে জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখা। বর্তমানে অনেক ওয়ার্ডে জনসংখ্যার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে, যার ফলে পরিষেবা প্রদান এবং প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রায় ১৬ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষের বসবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নাগরিক পরিষেবা আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের দাবি।
দুটি বিশেষ কমিটি করবে সমীক্ষা (Kolkata)
ডিলিমিটেশনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য কলকাতা পুরসভা দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিগুলি ওয়ার্ডভিত্তিক জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, নাগরিক সুবিধা এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখবে। প্রতিটি এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করা হবে। প্রশাসনের দাবি, এই সমীক্ষার ভিত্তিতেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত ওয়ার্ড কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।

প্রকৃত জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে ডিলিমিটেশন
পুর প্রশাসন জানিয়েছে, শুধুমাত্র ভোটার সংখ্যার ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত জনসংখ্যাকেও বিবেচনায় রাখা হবে। ভোটার তালিকার তথ্যের পাশাপাশি এলাকার প্রকৃত জনসংখ্যা, বসতি এবং নাগরিক পরিকাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই নতুন ওয়ার্ডের সীমারেখা নির্ধারণ করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রেখে প্রশাসনিক পরিষেবা আরও সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকাশ হবে খসড়া তালিকা (Kolkata)
ডিলিমিটেশনের কাজ শেষ হওয়ার পর একটি খসড়া তালিকা (ড্রাফট পাবলিকেশন) প্রকাশ করা হবে। সেই তালিকা প্রকাশের পর নাগরিকরা নিজেদের মতামত, দাবি বা আপত্তি জানাতে পারবেন। পুরসভা জানাচ্ছে, সাধারণ মানুষের দাবি ও আপত্তি খতিয়ে দেখার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। ফলে গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বহুতল দুর্ঘটনার পর নির্মাণে কড়া অবস্থান
অন্যদিকে গার্ডেনরিচ-তারতলা এলাকায় বহুতল ভেঙে পড়ার ঘটনার পর নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়মকানুন আরও কঠোর করা হয়েছে। ওই ঘটনার তদন্তের জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী, যাঁরা প্রায় তিন বছর আগে বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন জমা দিতে হবে। পুরসভার মতে, পুরনো আবেদনগুলিকে বর্তমান নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুযায়ী পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।
নির্মাণ অনুমোদনের বর্তমান চিত্র (Kolkata)
কলকাতা পুরসভার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে মোট ৩৪৪টি স্যাংশন প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে নতুন করে প্রায় ২০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এই আবেদনগুলির মধ্যে প্রায় ১৫০টির শুনানি সম্পন্ন হলেও বহু আবেদনকারী নির্ধারিত শুনানিতে উপস্থিত না হওয়ায় অনুমোদনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
মাত্র ১১টি আবেদন পেল সবুজ সংকেত (Kolkata)
প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের জন্য মোট ৪১টি আবেদন টেকনিক্যাল সাব-কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছিল। কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, সেগুলির মধ্যে মাত্র ১১টি আবেদন প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করায় অনুমোদনের ছাড়পত্র পেয়েছে। অন্যদিকে ২৩টি আবেদন বিভিন্ন ত্রুটি ও প্রয়োজনীয় নথির অভাবের কারণে পুনরায় সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই বিষয়ে টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শ্রমিকদের সার্টিফিকেশনেও আইনি জটিলতা (Kolkata)
পুর প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে নির্মাণ শ্রমিকদের সার্টিফিকেশন নিয়েও বেশ কিছু আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। দক্ষ শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি এবং সার্টিফিকেট প্রদান প্রক্রিয়ায় নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া গত তিন বছর ধরে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হলেও দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন পাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এই বিষয়েও প্রশাসন কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।

আরও পড়ুন: Kolkata Metro Rail: চালকবিহীন মেট্রোর পথে বড় সাফল্য, গ্রিন লাইনে মিলল প্রাথমিক ছাড়পত্র
প্রশাসনিক সংস্কারের পথে কলকাতা
ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে নির্মাণ অনুমোদন ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন দুই ক্ষেত্রেই কলকাতা পুরসভা বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে। একদিকে নাগরিক পরিষেবাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সহজলভ্য করার উদ্যোগ, অন্যদিকে নিরাপদ নির্মাণ এবং স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা এই দুই পদক্ষেপই আগামী দিনে শহর পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।



